Ajker Patrika

যে কারণে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ইউরোপের দাবানল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যে কারণে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ইউরোপের দাবানল
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ধরনের গাছ ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবানলগুলোকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। ছবি: এএফপি

ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস ও তুরস্কজুড়ে ভয়াবহ দাবানল ইউরোপকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কোথাও ঝোপঝাড় পরিষ্কারের যন্ত্র থেকে ছিটকে পড়া স্ফুলিঙ্গ, কোথাও ভারী যন্ত্রপাতি থেকে আগুনের সূত্রপাত হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলো শুধু আগুন লাগার কারণ। প্রকৃত সমস্যা হলো এমন পরিবেশ তৈরি হওয়া, যেখানে একটি ছোট আগুনও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভয়াবহ দাবানলে রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনা এবং একই ধরনের গাছের বিশাল বন—এই তিনটি কারণ মিলেই ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবানলগুলোকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

ফ্রান্সে দাবানলের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ একটি উচ্চভোল্টেজসম্পন্ন বৈদ্যুতিক লাইনের নিচে ঝোপঝাড় পরিষ্কারের সময় ব্যবহৃত যন্ত্রকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে স্পেনের তদন্তকারীরা কয়েকটি বড় দাবানলের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি থেকে ছিটকে পড়া স্ফুলিঙ্গকে দায়ী করেছেন।

তবে প্যান-ইউরোপীয় বন ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ফোরিস্কের সমন্বয়ক সিলভিয়া আব্রুস্কাতো ডয়চে ভেলেকে (ডি ডব্লিউ) বলেন, দাবানল কখনোই হঠাৎ তৈরি হয় না। এর জন্য উপযুক্ত আবহাওয়া ও পরিবেশগত পরিস্থিতি থাকতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পোড়ার মতো উদ্ভিদের পরিমাণ, সেই উদ্ভিদের শুষ্কতা এবং দাবানলের সময়ের আবহাওয়া।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের দাবানল পূর্বাভাস প্রকল্পের সমন্বয়ক ফ্রানচেস্কা দি জুসেপ্পে বলেন, এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে অনুকূল অবস্থায় থাকলে ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন তৈরি হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে স্পেন ও ফ্রান্সে চলতি গ্রীষ্মের দাবানলের জন্য দায়ী চরম আবহাওয়া অনেক বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ‘হাইড্রোক্লাইমেটিক হুইপল্যাশ’। এতে কোনো অঞ্চল খুব অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত আর্দ্র অবস্থা থেকে চরম শুষ্ক অবস্থায় চলে যায়।

পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ায় বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। ফলে ভারী বৃষ্টিপাত হয় এবং প্রচুর উদ্ভিদ জন্মায়। এরপর তাপপ্রবাহে সেই উদ্ভিদ দ্রুত শুকিয়ে দাবানলের জ্বালানিতে পরিণত হয়।

ফ্রানচেস্কা দি জুসেপ্পে ডয়চে ভেলেকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর জীবজ উপাদান তৈরি হয়েছে, যা কয়েক দফা তাপপ্রবাহে দ্রুত শুকিয়ে গেছে। পাশাপাশি বসন্তে উষ্ণ বায়ুমণ্ডল মাটি ও উদ্ভিদ থেকে দ্রুত পানি শোষণ করে নেয়। এতে খরা তীব্র হয়, বনভূমি শুকিয়ে যায় এবং আগুন লাগার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। সহজভাবে বলতে গেলে, শীত ও বসন্তের বৃষ্টি বনভূমিতে জ্বালানি তৈরি করে, আর গ্রীষ্মের খরা সেই জ্বালানিকে আগুন ধরার উপযুক্ত অবস্থায় নিয়ে যায়। চলতি বছর একই ধরনের তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে প্রায় একই সময়ে ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস ও তুরস্কে বড় বড় দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।

দাবানল আবার জলবায়ু পরিবর্তনকেও আরও ত্বরান্বিত করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দাবানল থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়েছে।

বন ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগুন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হওয়ার আরেকটি কারণ বন ব্যবস্থাপনা।

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত কাঠ উৎপাদনের জন্য বিশাল এলাকাজুড়ে একই ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে। এসব মনোকালচার বন দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

যুক্তরাজ্যের সেন্টার ফর ইকোলজি অ্যান্ড হাইড্রোলজির গবেষক ডগ কেলি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ফ্রান্স ও স্পেনে যেসব এলাকায় ভয়াবহ আগুন লেগেছে, সেখানে এমন গাছ রয়েছে যেগুলোতে খুব সহজে আগুন ধরে এবং ঘনভাবে বেড়ে ওঠায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের লঁদ দ্য গাসকোন বনভূমির ৭৫ শতাংশের বেশি অংশে রয়েছে মেরিটাইম পাইন। ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই মানবসৃষ্ট বন ১৮৫৭ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল। এই গাছের মোটা সূঁচের মতো পাতা মাটিতে জমে প্রচুর দাহ্য পদার্থ তৈরি করে। একই বয়স ও উচ্চতার বিপুলসংখ্যক গাছ থাকায় আগুন সহজেই এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

পর্তুগালের বনভূমির এক-চতুর্থাংশের বেশি এলাকায় রয়েছে ইউক্যালিপটাস। ২০১৭ সালের ভয়াবহ দাবানলে এই গাছের বন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইউরোপীয় কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক এলাকায় কৃষিজমি ও কম দাহ্য ঝোপঝাড়ের পরিবর্তে লাভজনক হওয়ায় পাইন ও ইউক্যালিপটাস লাগানো হয়েছে, যা দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

স্পেনে ফ্রাঙ্কো শাসনামলে এবং পরে প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর কৃষিজমি ও চারণভূমিতে পাইন ও ইউক্যালিপটাস লাগানো হয়েছিল।

সমাধানের পথ কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আগুন নেভানোর সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না। আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি কমাতে হবে। তাঁরা বলছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এ ছাড়া একই প্রজাতির বন পরিবর্তন করে বিভিন্ন ধরনের গাছের মিশ্র বন গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ খরা, ঝড়, পোকামাকড় ও দাবানলের বিরুদ্ধে তুলনামূলক বেশি টেকসই।

জার্মানির উদাহরণ দিয়ে গবেষকেরা বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে স্প্রুস গাছ লাগানো হয়েছিল। পরে দেখা যায়, এসব বন খরা ও বাকলখেকো পোকার আক্রমণে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখন ধীরে ধীরে সেগুলোকে মিশ্র বনে রূপান্তর করা হচ্ছে।

ওক, বিচ ও ম্যাপলের মতো প্রশস্ত পাতার গাছে আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং এগুলো তুলনামূলক কম দাহ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্তুগালের ২০১৭ সালের দাবানলে যেখানে পাইন ও ইউক্যালিপটাস বনে আগুনের শিখা চার মিটারের বেশি উঁচু হয়েছিল, সেখানে প্রশস্ত পাতার বনে আগুনের শিখার উচ্চতা দেড় মিটারের নিচে নেমে আসে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

এ ছাড়া বনভূমিতে গাছের সারির মধ্যে ফাঁকা জায়গা রাখা, নিচের ডালপালা ছেঁটে দেওয়া, শুকনো পাতা ও মৃত কাঠ সরিয়ে ফেলা এবং দাবানলের মৌসুম শুরুর আগে নিয়ন্ত্রিতভাবে ছোট আকারের আগুন দিয়ে নিচের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন বন বিশেষজ্ঞরা।

প্যান-ইউরোপীয় বন ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ফোরিস্কের সমন্বয়ক সিলভিয়া আব্রুস্কাতো বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বড় বিপর্যয় এড়াতে বনকে অবশ্যই সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘প্রতিরোধ, প্রতিরোধ এবং প্রতিরোধ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত