Ajker Patrika

অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসের পর হিটলারের ঐতিহাসিক ‘ইগলস নেস্ট’ নিয়ে নতুন বিতর্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৯: ৪৩
অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসের পর হিটলারের ঐতিহাসিক ‘ইগলস নেস্ট’ নিয়ে নতুন বিতর্ক
আগুনে জ্বলছে হিটলারের ‘ইগলস নেস্ট’। ছবি: এএফপি

জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের আল্পস পর্বতমালায় অবস্থিত নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র ‘ইগলস নেস্ট’ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবরের এই অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির অধিকাংশ কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রায় ২০০ অগ্নিনির্বাপণকর্মী সারা রাত চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খান। ঘটনার সময় পর্যটকদের জন্য স্থানটি বন্ধ থাকায় কেউ হতাহত হননি। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, তা নিয়ে জার্মানিতে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮৩৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত স্থাপনাটি জার্মান ভাষায় ‘কেলস্টাইনহাউস’ নামে পরিচিত। তবে বিশ্বজুড়ে এটি ‘ইগলস নেস্ট’ হিসেবেই পরিচিত। ১৯৩৮ সালে নির্মিত এই ভবন হিটলারের ক্ষমতা ও নাৎসি শাসনের প্রতীকী স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর নির্মাণে কাজ করেছিলেন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ শ্রমিক। মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ে নির্মিত ভবনটির জন্য ব্যয় হয়েছিল প্রায় তিন কোটি রাইখসমার্ক, যা বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ডের সমমূল্য।

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা সড়ক ও পাঁচটি সুড়ঙ্গ পেরিয়ে পর্যটকেরা সেখানে পৌঁছাতেন। এরপর পাহাড়ের পাথর কেটে তৈরি করা বিশেষ লিফটে চড়ে ভবনের প্রবেশপথে যেতে হতো। স্থাপত্যটির নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে দর্শনার্থীদের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষমতার আধিপত্যের অনুভূতি তৈরি হয়।

নাৎসি আমলের ইতিহাসবিদ ফেলিক্স বোর বলেন, হিটলার এমন স্থাপত্য পছন্দ করতেন, যা নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করার অনুভূতি দেয় যেকোনো মানুষকে। এসব স্থাপনার পরিকল্পনা ও নির্মাণেও তিনি সরাসরি যুক্ত থাকতেন।

রোববার (১ নভেম্বর) যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, হিটলারের ‘ইগলস নেস্ট’ স্থাপনাটি মূলত বিদেশি কূটনীতিক, রাষ্ট্রীয় অতিথি ও নির্বাচিত সাংবাদিকদের আপ্যায়ন এবং মুগ্ধ করার কাজে ব্যবহৃত হতো। হিটলার নিজে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৪ বার সেখানে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি আর সেখানে যাননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সঙ্গী ইভা ব্রাউন নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করতেন।

১৯৪৫ সালের ৪ মে ইগলস নেস্টে এক মার্কিন সেনা—নাৎসি বাহিনী যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
১৯৪৫ সালের ৪ মে ইগলস নেস্টে এক মার্কিন সেনা—নাৎসি বাহিনী যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

ইগলস নেস্টের কাছেই ছিল হিটলারের বাসভবন বার্গহফ। নাৎসি শাসনামলে তাঁর প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় কেটেছিল এই এলাকায়। ওবেরজালৎসবার্গ এলাকার এই বাসভবন থেকেই যুদ্ধ, গণহত্যা ও নাৎসি নিপীড়ন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানান সেখানকার ডকুমেন্টেশন সেন্টারের পরিচালক সভেন কেলার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সেনারা এলাকাটিকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন। পরে বার্গহফের অবশিষ্টাংশ ভেঙে ফেলা হয় এবং সেখানে গাছ লাগানো হয়। কিন্তু এতে হিটলার-সমর্থকদের গোপন তীর্থস্থানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। পরবর্তী সময়ে স্থাপনাটির ইতিহাস প্রকাশ্যে তুলে ধরা ও সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বর্তমানে বছরে তিন লাখের বেশি পর্যটক ইগলস নেস্ট পরিদর্শন করেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁর মানসিক অসুস্থতার পূর্ব ইতিহাস রয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বাভারিয়ার সংস্কৃতিমন্ত্রী মার্কুস ব্লুমে জানিয়েছেন, স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নির্মাণ ও হলোকাস্টের স্মৃতি সংরক্ষণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিশন গঠন করা হবে। তাঁর মতে, পুনর্নির্মাণের যেকোনো সিদ্ধান্তে নাৎসি ইতিহাসের দায় ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

তবে ইতিহাসবিদ ফেলিক্স বোর স্থাপনাটি পুনর্নির্মাণের বিপক্ষে। তাঁর মতে, অবশিষ্ট কাঠামো সংরক্ষণ করে সেখানে নাৎসি মতাদর্শ ও ইতিহাস তুলে ধরা উচিত। অন্যদিকে সভেন কেলারের মতে, ভবনটি হুবহু পুনর্নির্মাণ কিংবা ধ্বংসাবশেষ হিসেবে ফেলে রাখা—কোনোটিই যথাযথ সমাধান নয়। বরং আগের স্থাপনার অবশিষ্টাংশ, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতচিহ্ন ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে এর পরবর্তী ইতিহাস একসঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যথাযথ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ছাড়া স্থাপনাটি নাৎসি সমর্থকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ফলে ইগলস নেস্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এখন মূল প্রশ্ন—ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে স্থাপনাটিকে কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে তা কোনোভাবেই নাৎসি অতীতের মহিমাকীর্তনে পরিণত না হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত