Ajker Patrika

ন্যাটোভুক্ত কিছু দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ন্যাটোভুক্ত কিছু দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, রাশিয়া আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশ আক্রমণ করতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী কয়েক বছরে ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে সীমিত পরিসরের হামলা চালাতে পারেন। এর লক্ষ্য হবে মূলত জোটের দৃঢ়তা পরীক্ষা করা। নতুন মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে ছোট আকারের স্থল অভিযান পর্যন্ত রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী—এসব মূল্যায়ন এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত ঘাটতিতে পড়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে এসব অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ঝুঁকিতে থাকা মজুতের মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) ও আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমস (এটিএসিএমএস) এবং স্বল্পপাল্লার স্টিঙ্গার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র—জানিয়েছেন অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারাও।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন ছিল, ইউক্রেনে যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় পুতিন কোনো ন্যাটোভুক্ত দেশকে উসকানি দেবেন না। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছরের শুরুতে সেই মূল্যায়ন বদলে যায়। ইউক্রেনে পুতিন ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছেন এবং বিজয় নিশ্চিত করার জন্য দেশের ভেতর থেকেও তার ওপর চাপ বাড়ছে। ইউক্রেনের ড্রোনগুলো রুশ সেনাবাহিনী ও তেলশিল্পে ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে, বিপুল হতাহতের বিনিময়ে রুশ বাহিনী সম্মুখসারিতে তুলনামূলকভাবে ছোটখাটো অগ্রগতি অর্জন করছে।

মার্কিন ও ইউরোপীয় নেতারা ক্রমেই এমন কিছু লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন, যা থেকে বোঝা যায় রাশিয়া ন্যাটোর দৃঢ়তা যাচাই করতে পরীক্ষামূলক বা অনুসন্ধানমূলক হামলা চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পোল্যান্ডে রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পতন এবং রোমানিয়ার আকাশসীমায় রুশ ড্রোনের প্রবেশ।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকা অবস্থায় রাশিয়া যদি ন্যাটোর বিরুদ্ধে হামলা চালায়, তাহলে পুতিনের লক্ষ্য হবে জোটটিকে বিভক্ত করা। সম্ভাব্য রুশ অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেছেন আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো হিদার কনলি। তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা রাশিয়ার সবসময়কার একটি লক্ষ্য।’

ইউক্রেনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে পুতিন যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখন মস্কো অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপের মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে তার আগ্রাসী কর্মকাণ্ড আরও বাড়াতে চায় কি না, তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিশ্লেষণ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উদ্বেগের বিষয় হলো, পুতিন কোণঠাসা হয়ে পড়লে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। সম্ভাব্য হুমকির পরিসর বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে কোনো ন্যাটোভুক্ত দেশে সাইবার হামলা, পরিচয় গোপন রাখা সশস্ত্র গোষ্ঠী পাঠিয়ে কোনো ভূখণ্ড দখল করা, কিংবা জোটটির পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে সীমিত সামরিক অনুপ্রবেশ।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাশিয়া এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে চলতি শরৎকাল থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে। সবচেয়ে চরম পরিস্থিতি, অর্থাৎ সীমিত স্থল অভিযান বা ভূখণ্ডে সামরিক অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা কম। তবে সময় যত গড়াবে, সেই সম্ভাবনা তত বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের পদক্ষেপকে সবসময়ই অত্যন্ত অসম্ভাব্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে, কারণ এতে ন্যাটোর আর্টিকেল–৫ কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন উঠবে। এই ধারা জোটের সদস্যদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার করে। তবে সাইবার হামলা বা হাইব্রিড হুমকির ক্ষেত্রে ন্যাটো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সে বিষয়ে আর্টিকেল ৫ ততটা স্পষ্ট নয়।

হিদার কনলি বলেন, ‘আর্টিকেল ৫-এর আওতায় না পড়া কোনো হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, সেটিই সবসময় ন্যাটোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আর এখন পর্যন্ত এটা সত্য যে ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো উত্তেজনা বাড়াতে চায়নি।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০০৭ সালে এস্তোনিয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়ার ধারাবাহিক সাইবার হামলার কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এস্তোনিয়া সংকটটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে মোকাবিলা করার পথ বেছে নিয়েছিল।

ন্যাটোর মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডোনেল বলেন, ‘আমরা সবসময় বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করি এবং সেগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিই। ন্যাটো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি—যার প্রমাণ আমরা অব্যাহতভাবেই দিচ্ছি।’

নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়নগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু দূরপাল্লা ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতও কমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট, এসএম–৩ এবং টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড–THAAD) ইন্টারসেপ্টর, পাশাপাশি থাড রাডার এবং আকাশ প্রতিরক্ষা আর্টিলারি ইউনিট।

তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল অস্ত্রের মজুত ঘাটতির দাবিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য’ মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে ‘পর্যাপ্তের চেয়েও বেশি’ অস্ত্র রয়েছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেন, প্রেসিডেন্ট প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের আরও বেশি অস্ত্র উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন।

পারনেল বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যখন যেখানে আঘাত হানার নির্দেশ দেবেন, সেখানে এবং সেই সময়ে আঘাত হানার জন্য আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, সবই আমাদের কাছে রয়েছে। একাধিক কমব্যাট্যান্ট কমান্ডজুড়ে আমরা ইতোমধ্যেই সফল অভিযান পরিচালনা করেছি, একই সঙ্গে আমাদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষার জন্য গভীর ও প্রস্তুত অস্ত্রভান্ডারও বজায় রেখেছি। কোনো প্রতিপক্ষ যদি সংবাদমাধ্যমের শোরগোলকে আমেরিকার দুর্বলতা বলে ভুল করে, তাহলে তাকে কঠিন পথেই সত্যটি জানতে হবে।’

রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল এবং আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমস, যেগুলো দুটিই হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স) থেকে নিক্ষেপ করা যায়, এবং স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্র রুশ স্থল আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) টম কারাকো।

গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুতের এই ঘাটতি মার্কিন সরকারের ভেতরে অস্ত্রভান্ডার কমে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সময়ে ট্রাম্প ইরান নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা বিবেচনা করছেন।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সম্প্রতি হোয়াইট হাউসকে সতর্ক করেছেন যে আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা কমে গেছে। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কেইনের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয় হলেও তিনি মনে করেন, অস্ত্রের কম মজুত ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে এর ফলে ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

সরকারের বাইরের বিশ্লেষকরাও বারবার সতর্ক করে আসছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার বিশ্বজুড়ে প্রতিপক্ষদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। এর মধ্যে শুধু রাশিয়া নয়, চীনও রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত