Ajker Patrika

মৃত্যু ভাতার জন্য সেনাদের বিয়ে—রাশিয়ায় ‘ব্ল্যাক উইডো’ কেলেঙ্কারি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২২: ০২
মৃত্যু ভাতার জন্য সেনাদের বিয়ে—রাশিয়ায় ‘ব্ল্যাক উইডো’ কেলেঙ্কারি
যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সেনাসদস্যদের পরিবারকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেয় রুশ সরকার। ছবি: সিএনএন

ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রেক্ষাপটে রাশিয়ায় নতুন এক প্রতারণার অভিযোগ সামনে এসেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম ও কর্মকর্তারা যাঁদের ‘ব্ল্যাক উইডো’ নামে অভিহিত করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ। বলা হচ্ছে, এসব নারীর উদ্দেশ্য হলো—সামরিক বাহিনীতে সদ্য যোগ দেওয়া বা যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অপেক্ষায় থাকা পুরুষদের বিয়ে করে তাঁদের মৃত্যুর পর সরকারের দেওয়া বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাৎ করা।

এমনই এক ঘটনার শিকার বলে দাবি করেছেন সেন্ট পিটার্সবার্গের বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী মারিয়া। তিনি জানান, তাঁর ৫৯ বছর বয়সী বাবা ইউরি যে গোপনে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, তা তিনি জানতেনই না। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মাত্র দুই দিন আগে ইউরি বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়ের খবরও পরিবারের কেউ জানতেন না।

মারিয়া জানান, সামরিক বাহিনী থেকে তাঁর বাবার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পাশাপাশি তাঁকে জানানো হয়, নতুন স্ত্রীই এখন ইউরির আইনি নিকটাত্মীয়। ফলে সরকারের নির্ধারিত মৃত্যু ভাতার পুরো অর্থ তিনিই পাবেন। ওই নারী মারিয়ার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। পিতৃহারা মারিয়া বলেন, ‘আমি এই নারীকে কখনো দেখিনি, এমনকি বাবার মুখেও তাঁর নাম শুনিনি। শুরু থেকেই আমার মনে হয়েছে, এটি একটি প্রতারণা।’

রাশিয়ায় যুদ্ধে নিহত কোনো সেনাসদস্যের নিকটাত্মীয়কে অন্তত ৫০ লাখ রুবল ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা পৌনে এক কোটি টাকার বেশি। সরকারের এই আর্থিক সহায়তার উদ্দেশ্য ছিল—সেনাসদস্যদের পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু এখন অভিযোগ উঠেছে, সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র এই ব্যবস্থাকেই কাজে লাগাচ্ছে।

সম্প্রতি রাশিয়ায় একের পর এক এমন ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে দ্রুত বিয়ে, আবার কোথাও মৃত্যুশয্যায়ও বিয়ের অভিযোগ উঠেছে। গত বছর আলোচিত এক ঘটনায় একটি সামরিক হাসপাতালের এক নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি চিকিৎসাধীন অন্তত পাঁচজন গুরুতর আহত সেনাসদস্যকে বিয়ে করেছিলেন। সেনাদের মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি এমনটি করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠলে ওই নার্সকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘ব্ল্যাক উইডো’ প্রতারণার ঘটনাগুলোও ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। সংসদ সদস্য লিওনিদ স্লুতস্কি বলেছেন, যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাসদস্যদের পরিবারকে ‘ব্ল্যাক উইডো’, আর্থিক প্রতারক ও অন্যান্য অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁর মতে, এসব অপরাধ এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর রুশ সরকার নতুন সেনাসদস্যদের বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছিল। এর জন্য বিয়ের বয়সও শিথিল করা হয় এবং গণবিয়েরও আয়োজন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল—পরিবারভিত্তিক সমর্থন জোরদার করা এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রচারিত তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক মূল্যবোধ’-কে উৎসাহ দেওয়া।

তবে এই নীতিকেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে কিছু প্রতারক চক্র। গত বছর সাইবেরিয়ার টমস্ক শহরে ধারণ করা এক ভিডিও পডকাস্টে এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট প্রকাশ্যে পরামর্শ দেন, কোনো নারী যদি ফ্ল্যাট কিনতে চান, তাহলে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে যাওয়া একজন সেনাসদস্যকে বিয়ে করলেই হবে। তিনি দাবি করেন, সেনাসদস্য নিহত হলে কয়েক মিলিয়ন রুবল ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় এবং অনেক নারী নাকি সেই অর্থ দিয়ে সস্তায় ফ্ল্যাট কিনছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ওই এজেন্ট ও উপস্থাপককে আদালত কমিউনিটি সার্ভিসের দণ্ড দেন এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।

আরও কয়েকটি আলোচিত মামলায় দেখা গেছে, সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। কোথাও আদালত নতুন স্ত্রীর আইনি অধিকার বাতিল করেছেন, আবার কোথাও তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ অভিযোগও।

রুশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশটির দূরপ্রাচ্যের প্রিমোরস্কি ক্রাই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন সদস্য এতিম ও অসহায় পুরুষদের খুঁজে এনে তাঁদের বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। পরে তাঁদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হতো, যাতে নিহত হলে ক্ষতিপূরণের অর্থ ভাগাভাগি করা যায়। যদিও এই মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে আর কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মারিয়ার অভিযোগ, তাঁর বাবা শুধু মৃত্যু ভাতার প্রতারণারই শিকার হননি; নিজের অ্যাপার্টমেন্টটিও হারিয়েছেন। এখন তাঁর কাছে বাবার স্মৃতি বলতে রয়েছে শুধু একটি অকার্যকর চাবি। তিনি বলেন, ‘সবকিছু হারিয়ে গেছে। বাবার স্মৃতি ধরে রাখার মতো কিছুই আর আমার কাছে নেই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত