Ajker Patrika

বাংলাদেশের দরকার একটি নবযাত্রা—ব্রিটিশ এমপি রুপার নিবন্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৩০
বাংলাদেশের দরকার একটি নবযাত্রা—ব্রিটিশ এমপি রুপার নিবন্ধ
রুপা হক। ছবি: সংগৃহীত

কিছুদিন আগে আমার কর্মস্থলে এক সহকর্মী বললেন, ‘তোমার জেনে ভালো লাগবে যে আমি প্রবাসী ভোটটা দিয়ে দিয়েছি।’ ২০২৪ সালে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশে এই প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ওই আন্দোলনে শত শত শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিল। সাম্প্রতিক আলাপ থেকে জানলাম, আমার সেই সহকর্মীর শিকড়ও আমার মতোই একই ভূখণ্ডে—বাংলাদেশে।

আমি জানতে চাইলাম, ‘কাকে ভোট দিয়েছেন?’ তিনি বলেন, ‘জামায়াত।’ আমি পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম, ‘ইসলামপন্থীরা?’ তিনি যুক্তি দিলেন, ‘একবার ওদেরও সুযোগ দিয়ে দেখা যাক।’

একজন ব্যক্তির মতামত কখনোই পরিসংখ্যানগতভাবে যথেষ্ট নয়। কিন্তু ‘দুই পক্ষই খারাপ’ ধরনের বিরক্তি যদি সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত, তাহলে সদ্য নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত ইসলামি আদর্শভিত্তিক দল জামায়াত বড় সাফল্য পেতে পারত। দলটি কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। শেষ পর্যন্ত আগের বিরোধী দল বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি) বড় ব্যবধানে জয় পায়।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশের প্রথম নারী শাসক খালেদা জিয়া মারা গেছেন। ফলে এবারের লড়াই আর নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হওয়া ‘ব্যাটলিং বেগমস’ বা দুই বেগমের লড়াই ছিল না।

এর আগে, ২০১৭ সালে আমি ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। তখন আমরা দুজনের সঙ্গেই দেখা করি। শেখ হাসিনা তখন ক্ষমতায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর দল আওয়ামী লীগ সংসদের ৯০ শতাংশ আসন দখলে রেখেছিল। অন্যদিকে খালেদা জিয়া ছিলেন দুর্বল ও গৃহবন্দী অবস্থায়। তাঁর দল বিএনপি আসন্ন নির্বাচন বর্জন করেছিল। অভিযোগ, ভোটে কারচুপি হবে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন ছাত্রদের পছন্দের ব্যক্তি, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই দায়িত্ব নেন। নির্বাচনের সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্কারের গণভোটও যুক্ত করা হয়। তবে সমালোচকেরা এটিকে ‘হয় সব বা না হয় কিছুই নয়’ ধরনের কঠোর ভোট বলে আখ্যা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের ‘বর্ষা বিপ্লবের’ এক ছাত্রনেতাকে ডিসেম্বরে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতিশোধের রাজনীতি এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার স্মৃতি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এগুলো দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।

১৯৮১ সালে স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব নেন। শেখ হাসিনাও তাঁর পিতা, দেশের প্রথম নেতা, ১৯৭৫ সালে নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পান। পরে তাঁর দল টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় ছিল।

এখনকার সময়টি নতুন করে শুরু করার সুযোগ হতে পারত। পুরোনো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ ছিল। কিন্তু বেশি আশাবাদী হওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান এখন দলের উত্তরসূরি। ১৭ বছর ইংল্যান্ডের কিংস্টনে নির্বাসনে থাকার পর তিনি দেশে ফিরেছেন। শেখ হাসিনার আমলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনকে শেখ হাসিনা তাঁর গোপন আশ্রয়স্থল থেকে এক অডিও বার্তায় ‘একতরফা প্রহসন’ বলেছেন এবং ইউনূস সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছেন।

পঞ্চাশ বছরের কিছু বেশি সময়ের ইতিহাসে বাংলাদেশ বহু রক্তপাত দেখেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ভেঙে পড়া তৈরি পোশাক কারখানার দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের চেষ্টা চলছিল। কিন্তু জোর করে গুম, সাজানো নির্বাচন, সামরিক শাসন, হত্যাকাণ্ড ও অভ্যুত্থান যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে ওঠে।

একটি ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শেখ হাসিনা যখন ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা’ বাতিল করেন। আগে নিরপেক্ষ বিচারকেরা নির্বাচন তদারক করতেন। কারণ, দুই পক্ষ ও দুই পরিবারের মধ্যে অবিশ্বাস ছিল তীব্র। যখন যে পক্ষ এগিয়ে থাকে, তারা অন্য পক্ষকে দুর্নীতির অভিযোগে নিষিদ্ধ বা কারাবন্দী করে। এরপর বিরোধীরা ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে। একই চক্র বারবার ঘুরেফিরে আসে।

তরুণেরাই তথাকথিত ‘বাংলাদেশ–২.০’-এর সূচনা করেছিল। তাদের সংগ্রাম যদি শুধু পুরোনো ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তবে তা দুঃখজনক হবে। নতুন গঠিত এনসিপি নিয়ে শুরুতে উচ্ছ্বাস ছিল। কিন্তু তারা আশ্চর্যজনকভাবে আগে নিষিদ্ধ থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে।

বাংলাদেশে রাজতন্ত্র নেই, বংশগত পদও নেই। তবু রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে পরিবারকেন্দ্রিক। এই অবস্থা বদলাতে নতুন ও সতেজ শক্তির প্রয়োজন। দেখা যাক, এই তরুণেরা দেশের জন্য সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে কি না, নাকি পুরোনো অভ্যাসই আবার জিতে যায়।

তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত