স্পেনে ২ ট্রেনের সংঘর্ষের আগে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে চালকদের কথোপকথন ফাঁস

স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে ট্রেনচালক ও রেল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিং প্রকাশিত হয়েছে। স্পেনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব রেকর্ডিংয়ে দেখা যায়, একটি ট্রেন প্রায় ২৫ কিলোমিটার সামনে বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও অন্য একটি ট্রেনকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
গতকাল বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে মাদ্রিদ থেকে সেভিলগামী একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দিলে অন্তত ৬৯ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিবিসি জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর ট্রেনগুলোকে থামতে হয়েছিল। পরে কোনো ধরনের গতিসীমা আরোপ না করে ট্রেন চলাচলের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে মন্তব্য করেন।
স্পেনের সংবাদমাধ্যম এল পাইস ও আরটিভিই প্রকাশিত তিনটি অডিও রেকর্ডিংয়ে দুর্ঘটনার আগে দুই ট্রেনের চালকের সঙ্গে মাদ্রিদের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কথোপকথন উঠে এসেছে। রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের একটি ট্রেনে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন। এর সামনে একই লাইনে চলছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইরিওর একটি ট্রেন, যাতে ছিলেন ১৪৭ জন যাত্রী।
একটি রেকর্ডিংয়ে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তাকে রেনফের ট্রেনচালককে বলতে শোনা যায়, যাত্রা অব্যাহত রেখে বিকল্প সংকেতব্যবস্থার অধীনে স্বাভাবিক গতিতে চলতে। চালক স্বাভাবিক গতিতে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইলে কর্মকর্তা সম্মতি জানান।
অন্যদিকে, ইরিওর ট্রেনচালক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে জানান, ট্রেনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং ট্রেনটি চলছে না। উর্দা স্টেশনের প্রবেশসংকেতের সামনে ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকার কথাও জানান তিনি। পরে তাঁকে আবার যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী কথোপকথনে চালক জানান, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ট্রেনটি তখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এসব কথোপকথন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, রেনফের ট্রেন এগিয়ে আসার সময় ইরিওর ট্রেনটি যে স্থির অবস্থায় ছিল, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে জানানো হয়েছিল। ইরিও জানিয়েছে, তাদের ট্রেনটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় অন্য ট্রেনটি।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, হতাহতদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখতে দিনরাত কাজ করছে সরকার। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
এদিকে অডিও ফাঁসের ঘটনায় স্পেনের রাজনীতিকদের মধ্যে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বামপন্থী সুমার জোটের আইনপ্রণেতা আলবের্তো ইবানিয়েস ঘটনাটিকে নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেছেন। পডেমোস দলের নেতা আইরেনে মনতেরো বলেন, দুর্ঘটনার দায় কোনো একজন কর্মীর ওপর চাপানো উচিত নয়। রেল খাতের বেসরকারীকরণ ও উদারীকরণ নিয়ে চালক এবং বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে দুর্ঘটনার প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার স্পেনের রেলচালকদের পূর্বনির্ধারিত ধর্মঘট পালিত হয়েছে। চালকদের সংগঠন সেমাফ জানিয়েছে, রেল নিরাপত্তার স্বার্থেই এই কর্মসূচি। অন্যদিকে, মাদ্রিদে পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রায় দেড় হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়।
দুর্ঘটনাস্থলে রাতভর উদ্ধারকাজ চলে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ধার ও অনুসন্ধানে বিপুলসংখ্যক কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। স্পেনের সিভিল গার্ডের ৯০০-এর বেশি সদস্য বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ থেকে কাজ করছেন। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের সদস্যদের নির্ধারিত কেন্দ্রে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
২০১৩ সালে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার কাছে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত হয়েছিলেন। বুধবারের দুর্ঘটনাকে দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।









