Ajker Patrika

শীত আসছে, গ্যাস-সংকটে ইউরোপের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে বাংলাদেশকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ৫৯
শীত আসছে, গ্যাস-সংকটে ইউরোপের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে বাংলাদেশকে
ছবি: ডয়েচভেল

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তেলের তুলনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আসন্ন শীতে ইউরোপকে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে এলএনজি নিয়ে কঠিন প্রতিযোগিতায় নামতে হতে পারে। এতে বাংলাদেশসহ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র আমদানিকারক দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল।

প্রতিবেদনে বলা হয়—গত শুক্রবার বাংলাদেশ চারটি এলএনজি কার্গোর জন্য প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ২৮ দশমিক ০৩ ডলার পরিশোধ করেছে। এই দাম প্রতি ব্যারেল তেলের প্রায় ১৬৩ ডলারের সমান। একই দিনে কাতার একটি খালি এলএনজি ট্যাংকারকে উপসাগরে পাঠানোর চেষ্টা করলেও কয়েক ঘণ্টা পর ‘আল গাশামিয়া’ নামের জাহাজটি ফিরে যায়। ঘটনাটি হরমুজ ঘিরে এলএনজি পরিবহনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তেলের ট্যাংকারের তুলনায় এলএনজি জাহাজ পরিচালনাও অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বড় ক্রুড অয়েল ট্যাংকারের দাম প্রায় ১৩ কোটি ডলার এবং তাতে প্রায় ১৯ কোটি ডলারের তেল পরিবহন করা যায়। বিপরীতে একটি এলএনজি ট্যাংকারের দাম প্রায় ২৪ কোটি ডলার, অথচ বহন করা গ্যাসের মূল্য প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। যুদ্ধক্ষেত্রে এমন জাহাজ পাঠানোর ঝুঁকি তাই তুলনামূলকভাবে বেশি।

গত জুলাইয়ে কাতারের এলএনজি ট্যাংকার ‘আল রেকায়্যাত’ হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হয় এবং এর ইঞ্জিনরুমে আগুন ধরে যায়। ৩১ জুলাই ‘গ্যাসলগ সাংহাই’ নামের আরেকটি জাহাজও একই ধরনের হামলার মুখে পড়ে। পরে দুটি জাহাজের গ্যাস অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হয়।

এদিকে কাতারের রাস লাফানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় গ্যাস তরলীকরণ কেন্দ্রগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। তেলের মতো এলএনজি বিকল্প পাইপলাইনে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। যুদ্ধের শুরুতে ইরানি হামলায় কাতারের এলএনজি স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১৭ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক বছরের জন্য বন্ধ থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যার বড় অংশ কাতারের।

ইউরোপের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। গত সপ্তাহের শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস মজুত ছিল মাত্র ৬৬ শতাংশের কিছু কম। যেখানে এ সময়ে গড় মজুত থাকার কথা প্রায় ৮৩ শতাংশ। শীত শুরু হলে অক্টোবরের শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মজুত থেকে গ্যাস তোলা শুরু হবে। মজুত কমে গেলে গ্যাস উত্তোলনের সর্বোচ্চ সক্ষমতাও কমে যায়।

যদিও ইউরোপে গ্যাসের ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভর করার সুযোগও নেই। ইউরোপের তাপ সরবরাহের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় শীত তীব্র হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে পারে।

ইউরোপের গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জলাধারগুলোর পানিও কমেছে। শক্তিশালী এল নিনোর কারণে তুলনামূলক উষ্ণ ও বৃষ্টিপাতপূর্ণ শীতের সম্ভাবনা থাকলেও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে আকস্মিক তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ফলে ইউরোপকে গত শীতের তুলনায় এবার আরও বেশি এলএনজি আমদানি করতে হতে পারে। কিন্তু উপসাগরীয় এলএনজি রপ্তানি যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, ইউরোপকে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বেশি দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে হবে। এতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। গত এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে; অথচ একই পরিমাণ কাতারি চুক্তিবদ্ধ গ্যাস কিনতে খরচ হতো প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও নাইজেরিয়ায় নতুন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে চলতি শীতেই সংকটের সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই ব্রাসেলস ও লন্ডনের নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি বাংলাদেশসহ বড় এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোকেও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত