Ajker Patrika

মাতৃত্বকালীন ছুটিতে মেয়র, জাপানজুড়ে বিতর্কের ঝড়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মাতৃত্বকালীন ছুটিতে মেয়র, জাপানজুড়ে বিতর্কের ঝড়
জাপানের বিখ্যাত শহর ইয়াওয়াতার মেয়র শোকো কাওয়াতা। ছবি: সংগৃহীত

জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি ছোট শহরের মেয়র যখন ঘোষণা দিলেন যে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি নিতে যাচ্ছেন, তখন তিনি জানতেন যে বিষয়টি নিয়ে কিছু ভ্রু কুঁচকানো প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াটি যে এতটা তীব্র এবং সমাজকে এভাবে বিভক্ত করে ফেলবে, তা সম্ভবত কল্পনাও করেননি ৩৫ বছর বয়সী শোকো কাওয়াতা।

জন্মহার বাড়াতে হিমশিম খাওয়া জাপানে এখন এক জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছেন এই তরুণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সন্তান জন্মদানের জন্য ছুটি নেওয়া উচিত কি না—তা নিয়েই এখন তোলপাড় চলছে দেশটিতে।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাওয়াতা বলেন, ‘আমি সত্যিই খুব অবাক হয়েছি, কারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল বিশাল।’

জাপানের কিয়োটো অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মন্দির ও চেরি ফুলের জন্য বিখ্যাত শহর ইয়াওয়াতা। এই শহরের সিটি হলের পঞ্চম তলার একটি সভাকক্ষে বসে কথা বলছিলেন কাওয়াতা। পাশে বসা তাঁর দুই বয়োজ্যেষ্ঠ ডেপুটি মেয়র।

যেহেতু জাপানে স্থানীয় নির্বাচিত কর্মকর্তাদের সন্তান জন্মদানের জন্য ছুটি নেওয়ার কোনো আইনি কাঠামো নেই, তাই কাওয়াতা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মাতৃত্বকালীন ছুটি’ নিতে পারছেন না। এর পরিবর্তে, তিনি তাঁর দায়িত্ব সাময়িকভাবে হস্তান্তর করছেন তাঁর বাম পাশে বসা ডেপুটি মেয়র, ৬২ বছর বয়সী শিগেতো নোসের কাছে।

গত মে মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে কাওয়াতা তাঁর এই পরিকল্পনার কথা জানান। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সন্তান প্রসবের তারিখ রয়েছে। এর দুই মাস আগে এবং দুই মাস পরে—মোট চার মাস তিনি দায়িত্ব থেকে দূরে থাকবেন। এর মাধ্যমে জাপানের ইতিহাসে প্রথম কোনো মেয়র হিসেবে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন তিনি।

কাওয়াতা জানান, তাঁর কার্যালয়ের সহকর্মীরা (যাদের গড় বয়স ৩৯ বছর) তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। তবে সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স এবং ইউটিউবে এটি নিয়ে হাজার হাজার মিশ্র মতামত দেখা গেছে।

পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক

অনেকে কাওয়াতার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। একজন মন্তব্য করেছেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ এবং কাওয়াতা তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আমাদের সমাজ গর্ভবতী নারীদের কথা মাথায় রেখে কোনো ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

আরেকজন লিখেছেন, ‘পরিবারকে প্রাধান্য দিয়ে কাওয়াতা একটি চমৎকার উদাহরণ তৈরি করছেন, যা ভবিষ্যতে অন্য নারীদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করবে।’

তবে সমালোচকদের সুর বেশ কঠোর। তাঁদের মতে, সরকারি দায়িত্ব থেকে দূরে থাকা ‘দায়িত্বশীলতা নয়’। একজন লিখেছেন, ‘যদি তাঁর সন্তান নেওয়ারই ইচ্ছে থাকত, তবে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই নেওয়া উচিত ছিল।’ আরেকজনের দাবি, ‘শীর্ষ কর্মকর্তারা যদি দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি নিতে চান, তবে তাঁদের পদত্যাগ করা উচিত।’ কেউ কেউ মেয়রের মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বেতন কাটারও দাবি তুলেছেন।

সমালোচনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে কাওয়াতা গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা যদি মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার জন্য নারী রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করি, তবে তার অর্থ হলো আমরা পরোক্ষভাবে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী সন্তান ধারণে সক্ষম সব নারীকে সরকারি পদে আসতে বাধা দিচ্ছি।’

হিরোশিমা অঞ্চলের আকিটাকাটা শহরের সাবেক মেয়র শিনজি ইশিমারু মনে করেন, আসল সমস্যা ছুটি নেওয়া নয়, বরং ছুটির সময়ে নাগরিক সেবা কীভাবে সচল রাখা যায় তা নিশ্চিত করা। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে তিনি বলেন, সবাই একমত যে মাতৃত্বকালীন ছুটি ভালো জিনিস। তবে এই ঘটনাটি যেন প্রশাসনের কাজ ব্যাহত না করে একটি গঠনমূলক সমাধানের পথ তৈরি করে।

পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির বেড়াজাল

মাত্র ৩৩ বছর বয়সে জাপানের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ নারী মেয়র নির্বাচিত হন শোকো কাওয়াতা। কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডিগ্রি নেওয়া কাওয়াতা জাপানের পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে উঠে এসেছেন।

গত বছরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জাপানের ১ হাজার ৭২০ জন স্থানীয় মেয়রের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ নারী। দেশটিতে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ক্যাবিনেট অফিসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজনীতিতে নারীদের আসার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো হলো—গর্ভাবস্থা, ‘রাজনীতি কেবল পুরুষের কাজ’ এমন সামাজিক ধারণা এবং নানামুখী হয়রানি।

বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও লিঙ্গবৈষম্য সূচকে জাপানের অবস্থান বেশ নিচে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২৫ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪৬টি দেশের মধ্যে জাপানের অবস্থান ১১৮ তম। জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে জাপানের পারফরম্যান্স সবচেয়ে খারাপ।

প্রজন্মের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন

যদিও জাপানে আইনগতভাবে মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং বেতনের নিশ্চয়তা রয়েছে, তবুও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই তা ব্যবহার করেন না।

ডেপুটি মেয়র শিগেতো নোসে বলেন, ‘অনেকেই কৌতূহল নিয়ে দেখছেন যে একজন নারী মেয়র পদে থেকে কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলান।’

দুই সন্তানের জনক ৬২ বছর বয়সী নোসে স্বীকার করেন যে তিনি নিজের জীবনে কোনো পিতৃত্বকালীন ছুটি নেননি এবং সন্তান লালন-পালনের পুরো দায়িত্বই তাঁর স্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। নোসে বলেন, ‘আমি যখন বাড়ি ফিরতাম, ক্লান্ত থাকতাম। রাতে বাচ্চা কাঁদলেও স্ত্রীই সামলাত। এখন পেছনে তাকালে আমার মনে হয়, বিষয়টি নিয়ে আমার অনুশোচনা করা উচিত।’

তবে সময়ের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে নোসে জানান, তাঁর জামাতা এখন তাঁর মেয়ের দ্বিতীয় সন্তান লালন-পালনের জন্য ছয় মাসের ছুটি নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি দেখে আমার খুব ভালো লাগে। সময় সত্যিই বদলেছে এবং তাদের এভাবে একসঙ্গে কাজ করতে দেখাটা আনন্দের।’

মেয়র কাওয়াতা মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনার একটি বড় কারণ হলো জাপানিদের পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে ভাবা হয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকবে না এবং তাঁরা সম্পূর্ণভাবে জনগণের জন্য উৎসর্গীকৃত হবেন।

ভবিষ্যতে তাঁর সন্তান যখন বড় হয়ে তার এই গর্ভাবস্থা ও মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে দেশব্যাপী আলোড়নের কথা জানবে, তখন সে কী ভাববে? এমন প্রশ্নে হাসিমুখে কাওয়াতা বলেন, ‘আমি আশা করি সে অবাক হবে।’

তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা দরকার যেখানে নারীদের ক্যারিয়ার এবং পরিবারের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে না, বরং তাঁরা দুটিই একসঙ্গে সহজে করতে পারবেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত