
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ করে ইরানের সঙ্গে শান্তি চান। বিনিময়ে ইরানের কাছে ৫ বছরের জন্য তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। ট্রাম্পের প্রশাসন তেহরানের কাছে মোট ৬টি অঙ্গীকার চেয়েছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে—ওয়াশিংটন ও ইরানের অবস্থান আরও দূরে সরে যাচ্ছে। একই সময়ে হোয়াইট হাউস যুদ্ধবিরতির আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, যুদ্ধ থামানো ছাড়া আলোচনা শুরুই সম্ভব নয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইউকের খবরে বলা হয়েছে, তিন সপ্তাহের বেশি সংঘাত চলার পর উভয় পক্ষই পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে। একদিকে কূটনীতির প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত, অন্যদিকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের দাবিতে কঠোর ভাষা।
ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির পক্ষে নন। তাঁর যুক্তি—তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। গত শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি যুদ্ধবিরতি চাই না...আপনি যখন প্রতিপক্ষকে কার্যত ধ্বংস করে দিচ্ছেন, তখন যুদ্ধবিরতি করা হয় না।’
সংঘাতের শুরুর দিকে তিনি আরও বলেছিলেন, ইরানের নেতৃত্ব ভেঙে পড়লেই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘এক সময় হয়তো আত্মসমর্পণ করতে চাই—এটা বলার মতো কেউই বেঁচে থাকবে না।’
এরপর, গত রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেন, ‘ইরানকে সংযম দেখাতে বলা অর্থহীন।’ তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই সংঘাত শুরু করেছে, তাই তাদেরই তা বন্ধ করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক সমঝোতা চায় যাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কার্যক্রমের ওপর কঠোর সীমা আরোপ থাকবে। শনিবার ইসরায়েল সতর্ক করে জানায়, তেহরান এমন আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা লন্ডন পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। এতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে জানায়, সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনায় ট্রাম্পের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ যুক্ত ছিলেন। তবে যুদ্ধ শেষের যে কোনো চুক্তিতে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ মোকাবিলা করা এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত থমকে আছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ নেই। তবে মিসর, কাতার ও যুক্তরাজ্য এমনিক তুরস্কও বার্তা আদান-প্রদান করেছে। ইরান বলছে, তাদের শর্ত মানা হলেই কেবল আলোচনা সম্ভব। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি, ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিশ্চয়তা এবং ক্ষতিপূরণ। ট্রাম্প ইতিমধ্যে এসবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তারা ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তেহরান আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। তবে মার্কিন দাবিগুলোর মধ্যে পাঁচ বছর ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামানো এবং ২০২৫ সালে বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি ও ফোরদো ফুয়েল এনরিচমেন্ট প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেওয়ার মতো শর্ত রয়েছে, যা তেহরান মানবে না বলেই ধারণা।
এ ছাড়া পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারে এমন সেন্ট্রিফিউজ তৈরির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নজরদারির দাবিও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও শর্তের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা ১ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত রাখা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি ও গাজার হামাসের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের অর্থায়ন বন্ধ করা।
ইরান অতীতে এসব দাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, যদিও তারা একাধিক বোমা তৈরির মতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। ট্রাম্পের প্রতি অবিশ্বাসও আলোচনার পথে বাধা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা আলি লারিজানির হত্যাকাণ্ড। তিনি ইরানের প্রধান আলোচক ছিলেন। এতে আরও কঠোরপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শনিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি প্রণালি খুলে না দেয়, তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ সতর্ক করেছেন, অবকাঠামোর ওপর হামলা হলে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি ও তেল স্থাপনা ‘অপরিবর্তনীয়ভাবে ধ্বংস’ করা হবে। রয়টার্সকে দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানিয়েছে, হামলা বন্ধ না হলে ইরান যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করবে না। দেশটির নেতৃত্ব যুদ্ধের মধ্যেও ছাড় দেওয়ার চাপ প্রত্যাখ্যান করেছে। কিছু কর্মকর্তা বলেছেন, কেবল ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ ঘটলেই তারা কার্যক্রম বন্ধ করবে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি উত্তেজনা হ্রাসের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, শান্তি প্রচেষ্টার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘হাঁটু গেড়ে বসতে’ হবে তথা আত্মসমর্পণ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন।
তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় মার্কিন হামলা হলে পুরো অঞ্চলে মার্কিন সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা হবে, যার মধ্যে ইসরায়েলের জ্বালানি অবকাঠামোও রয়েছে। রোববার এক সামরিক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের অবকাঠামোতে হামলা করলে আমরাও আপনাদেরটিতে হামলা করব।’
হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, এই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় আগ্রহী নয় এবং সামরিক অভিযান ‘বাধাহীনভাবে’ চলবে। তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্যই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
ইরানও পাল্টা বিশ্বাস করে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝোতায় বাধ্য করবে। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, সামরিক শক্তি দিয়ে খুব সহজেই নৌপথ নিরাপদ করা সম্ভব। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সদস্য আলাউদ্দিন বরুজার্দি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কিছু জাহাজের কাছ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এটি নতুন আয়ের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের খরচ আছে। তাই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে ফি নেওয়া স্বাভাবিক।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে কি না—এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করার পর ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে।
১ ঘণ্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান সংকট নিরসনে আকস্মিক পাঁচ দিন হামলা স্থগিতের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের এই নমনীয় সিদ্ধান্তকে ‘কৌশলগত আত্মসমর্পণ’ হিসেবে অভিহিত করে ইরানের ভেতরে নতুন দফায় বড় ধরনের বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েলি...
১ ঘণ্টা আগে
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে জেরাল্ড ফোর্ড এবং আব্রাহাম লিঙ্কন—এই দুটি রণতরি থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে বিশাল বিমান হামলা চালানো হয়। কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান সমৃদ্ধ এই রণতরি দুটি ইরান অভিযানে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
১ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর রাশিয়া ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয় ফোনালাপ করেছেন। তেহরানের উদ্যোগে এই ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। ফোনালাপে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান...
১ ঘণ্টা আগে