
পূর্ণিমার রাতে মানুষের আচরণ বদলে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়, এমনকি অপরাধ প্রবণতাও বাড়ে—এমন ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলিত। এই বিশ্বাসকে ‘লুনাসি ইফেক্ট’ বা ‘লুনার ইফেক্ট’ বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা জায়গায় প্রায়ই দাবি করা হয়, পূর্ণিমার প্রভাবে মানুষ বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, এ সময় ঝগড়া-বিবাদ, সড়ক দুর্ঘটনা বা অপরাধের ঘটনা বেড়ে যায়।
এই ধারণার শিকড় প্রাচীনকালেই।
‘লুনাসি’ শব্দটি এসেছে লাতিন Luna থেকে, যার অর্থ চাঁদ। প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত, পূর্ণিমার চাঁদ মানুষকে ‘পাগল’ বা ‘উন্মাদ’ করে তুলতে পারে। এখান থেকেই ইংরেজি ‘Lunatic’ (লুনাটিক) শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বা উন্মাদ। মধ্যযুগ ও পরবর্তী সময়েও এই কুসংস্কার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমনকি আঠারো শতকের ইংল্যান্ডে পূর্ণিমার রাতে অপরাধ করলে তাকে কখনো কখনো সরাসরি দোষী না ধরে ‘উন্মাদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আইনজ্ঞ উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোনও তাঁর লেখায় এমন ধারণার উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেছেন—কিছু মানুষ পূর্ণিমার সময় মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পূর্ণিমার রাতে মানুষের আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। অনেকে মনে করেন, এ সময়ে মানুষ বেশি উত্তেজিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, ফলে ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি এবং সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। কিছু পুলিশ কর্মকর্তা বা জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরাও ধারণা দেন যে, পূর্ণিমার রাতে অপরাধের হার বা আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ঘুমের ব্যাঘাতের কথাও বলা হয়—পূর্ণিমায় মানুষের গভীর ঘুম কমে যায়, তারা বারবার জেগে ওঠে এবং এর প্রভাবে পরদিন মেজাজ খিটখিটে থাকে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হয়; যেমন—পূর্ণিমার সময়ে হাসপাতালে কামড় খাওয়া প্রাণীর সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধির তথ্য উল্লেখ করা হয়।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলোচিত দাবিগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ১৯৮৫ সালে মনোবিজ্ঞানী জেমস রোটন এবং আইভান কেলি গত কয়েক দশকের শত শত গবেষণা বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত রিপোর্ট প্রকাশ করেন। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, পূর্ণিমার রাতের সঙ্গে মানসিক হাসপাতালে রোগী ভর্তি, অপরাধ, আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা বা জন্মহারের কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক নেই।
চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাবের যুক্তিও বৈজ্ঞানিকভাবে টেকসই নয়। অনেকেই মনে করেন, চাঁদ যেহেতু সমুদ্রের জলরাশিকে প্রভাবিত করে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি করে, তাই মানুষের শরীরের জলীয় অংশও প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহাকর্ষীয় বল বস্তুর ভরের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্র বিশাল হওয়ায় সেখানে প্রভাব দৃশ্যমান হলেও মানুষের শরীরের ভর এতই কম যে চাঁদের প্রভাব কার্যত উপেক্ষাযোগ্য। তুলনামূলকভাবে, একটি ছোট পোকামাকড় বা কাছাকাছি থাকা কোনো দালানের মহাকর্ষীয় প্রভাবও মানুষের ওপর চাঁদের চেয়ে বেশি হতে পারে।
তবে ঘুমের ওপর কিছু সীমিত প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব বাসেলের গবেষকেরা ৩৩ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেন, পূর্ণিমার সময়ে মানুষের মেলাটোনিন হরমোনের স্তর কিছুটা কমে যেতে পারে। এই হরমোনটি ঘুম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৩ সালের ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, পূর্ণিমার রাতে মানুষের গভীর ঘুম গড়ে প্রায় ২০ মিনিট কম হতে পারে এবং ঘুমাতে সামান্য বেশি সময় লাগতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গবেষণাটি এমন পরিবেশে করা হয়েছিল যেখানে অংশগ্রহণকারীরা চাঁদ দেখতে পাননি। ফলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, এটি চাঁদের আলো নয়; বরং মানুষের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যা চাঁদের চক্রের সঙ্গে অভিযোজিত হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা ‘লুনাসি ইফেক্ট’-এর জনপ্রিয়তার পেছনে ব্যক্তিগত পক্ষপাতের ভূমিকার কথা বলেন। একে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত বলা হয়। অর্থাৎ, মানুষ পূর্ণিমার রাতে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোকে সহজে মনে রাখে এবং সেগুলোকে চাঁদের প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু অন্য সময়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও তা সাধারণ ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা করা হয়। এই প্রবণতাকে ‘ইলিউসরি কোরিলেশন’ বা কাল্পনিক সম্পর্কও বলা হয়।
এ ছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক আলো আবিষ্কারের আগে পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলো মানুষের রাতের ঘুমে প্রভাব ফেলত। ঘুমের ঘাটতি মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা পেতে শুরু করে।
একই ভাবে, পূর্ণিমার আলোতে রাতের কার্যক্রম বাড়ার কারণে মানুষ ও প্রাণী উভয়ের মধ্যেই চলাফেরা ও সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ত, যা পরবর্তীকালে ভুলভাবে চাঁদের প্রভাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সরাসরি চাঁদের প্রভাবের প্রমাণ নেই। বরং পূর্ণিমার রাতে আলোর পরিমাণ বেশি থাকায় প্রাণীরা বেশি সক্রিয় থাকে এবং একে অপরের সংস্পর্শে আসে, ফলে সংঘাত বা কামড়ানোর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বাড়তে পারে। এটি এই বিষয়ের সবচেয়ে আলোচিত গবেষণা। ২০০০ সালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে দেখা গেছে যে, পূর্ণিমার সময় কামড় খেয়ে হাসপাতালে আসা পশুর সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, এটি চাঁদের কোনো অতিলৌকিক শক্তির কারণে নয়, বরং উজ্জ্বল আলোতে প্রাণীদের বর্ধিত সক্রিয়তার কারণ।
তবে ফিনল্যান্ডে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত ধারণার উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে পূর্ণিমার সময় বরং অপরাধ বা খুনের হার কিছুটা কম ছিল।
সিদ্ধান্ত
পূর্ণিমার রাতে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই ধারণা মূলত লোকবিশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাত এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ফল।

মতিঝিল থানা বিএনপির সভাপতি শিবলুর রহমান শিবুকে জনগণ গণপিটুনি দিয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ‘Prime New Fanny Bd’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে আলোচিত দাবিতে আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ২টার দিকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়...
১৬ ঘণ্টা আগে
এখন ২০২৬ সাল। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইথিওপিয়া নিয়ে এমন একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে—সারা দুনিয়ায় এখন ২০২৬ সাল চললেও ইথিওপিয়ায় কেবল ২০১৯ সাল শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ৭ থেকে ৮ বছর পিছিয়ে এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছরের পুরোনো নিজস্ব...
২১ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর করমর্দনের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।
৫ দিন আগে
সম্প্রতি একটি ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে—ছবিটি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের।
৫ দিন আগে