Ajker Patrika

লাদাখে বাবার অনশনে ছুটে গিয়েছিলেন ইন্দিরা, ছেলে ওয়াংচুককে পুলিশ দিয়ে তুলে নিয়ে গেলেন মোদি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
লাদাখে বাবার অনশনে ছুটে গিয়েছিলেন ইন্দিরা, ছেলে ওয়াংচুককে পুলিশ দিয়ে তুলে নিয়ে গেলেন মোদি
১৯৮৪ সালে লাদাখকে তফসিলি উপজাতি বা শিডিউলড ট্রাইব (এসটি) মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে আমরণ অনশনে বসেছিলেন ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংয়াল। পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে লেহ্ সফর করে দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ২১ দিন ধরে আমরণ অনশনরত লাদাখের অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুককে (৫৯) আজ সকালে শয্যা থেকে তুলে হাসপাতালে স্থানান্তর করেছে মোদি সরকার। অনশনের কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে উল্লেখ করে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে আন্দোলনের আয়োজকেরা অভিযোগ করেছেন, ওয়াংচুককে জোর করে অনশনস্থল থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ।

দিল্লির এই নাটকীয় ঘটনাটি চার দশকেরও বেশি সময় আগে লাদাখের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ওয়াংচুকের বাবার এক ঐতিহাসিক অনশনের স্মৃতিকে নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। আজকের এই দৃশ্য লাদাখের প্রবীণদের কাছে চেনা একটি অতীত। ১৯৮৪ সালে ঠিক একইভাবে লাদাখের মানুষের অধিকার আদায়ে অনশনে বসেছিলেন সোনম ওয়াংচুকের বাবা প্রবীণ রাজনীতিবিদ সোনম ওয়াংয়াল।

১৯২৩ সালে জন্ম নেওয়া লাদাখের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংয়ালের। পরবর্তীতে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের বিধান পরিষদের সদস্য এবং রাজ্য সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে লাদাখের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা এবং তাঁদের পিছিয়ে পড়া অর্থনৈতিক-শিক্ষাগত অধিকার নিশ্চিত করতে আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি।

১৯৮৪ সালে লাদাখকে তফসিলি উপজাতি বা শিডিউলড ট্রাইব (এসটি) মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে আমরণ অনশনে বসেছিলেন ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংয়াল। পরবর্তীতে এই আন্দোলন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে লেহ্ সফর করেন এবং দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। যদিও সেই আশ্বাস তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, তবে পাঁচ বছর পর ১৯৮৯ সালে সংবিধানের ৩৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে একটি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বালতি, বেদা, বোট, ব্রোকপা, চ্যাংপা, গারা, মোন ও পুরিগপাসহ লাদাখের আটটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপজাতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা ছিল লাদাখের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক জয়।

ঠিক চার দশক পর, আজ ২০২৬ সালে এসে তাঁর ছেলে সোনম ওয়াংচুকও লাদাখবাসীর অধিকার ও সুরক্ষার জন্য অনশনের পথকেই বেছে নিয়েছেন। গত বছরও তিনি লাদাখের স্বায়ত্তশাসন এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষার দাবিতে টানা ৩৫ দিন অনশন করেছিলেন। তবে যন্তর মন্তরে তাঁর চলমান অনশনের বিষয়টি লাদাখকেন্দ্রিক নয়। এবার তিনি ভারতের সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এবং জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংহতি জানিয়ে অনশনে বসেছিলেন। তবে লাদাখে বাবার অনশনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছুটে গেলেও ওয়াংচুককে পুলিশ দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে মোদি সরকার।

সর্বভারতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট (এনইইটি) প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্ক এবং দেশজুড়ে পরীক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামক একটি সংগঠনের ব্যানারে চলমান এই আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন শুরু করেন ওয়াংচুক। এই আন্দোলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানানো হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, পরীক্ষা ব্যবস্থায় জালিয়াতি ও মানসিক চাপের কারণে দেশের অন্তত ১৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে, যার দায় সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর ওপর বর্তায়।

চার দশক আগে বাবা অনশন করেছিলেন লাদাখের উপজাতিদের আইনি অধিকার ও পরিচিতি রক্ষার লড়াইয়ে, আর আজ ছেলে অনশন করছেন ভারতের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষার তাগিদে। ইতিহাসের এই অদ্ভুত সমাপতনে লাদাখের একই পরিবারের দুই প্রজন্মের গল্পে দেখা যাচ্ছে, দেশের নীতি নির্ধারকদের কান পর্যন্ত নিজেদের দাবি পৌঁছে দিতে দুজনেই শরীরকে সবচেয়ে বড় অহিংস অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত