Ajker Patrika

মার্কিনিদের দ্রুত ইরান ছাড়তে বলল ট্রাম্প প্রশাসন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩: ০৭
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে বিক্ষোভ চলছে। ছবি: এএফপি
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে বিক্ষোভ চলছে। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের ইরান ত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছে। এই বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এল, যখন ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন বন্ধের চাপ অব্যাহত রেখেছে এবং এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি সরকারের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছেন।

কানাডার সংবাদমাধ্যম সিবিসি নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের জন্য পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভার্চুয়াল অ্যাম্বাসি’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ‘এখনই ইরান ত্যাগ করুন।’ এতে আরও বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে ইরান ছাড়ার জন্য নিজস্ব পরিকল্পনা রাখুন।’

যেসব মার্কিন নাগরিক ইরান ছাড়তে পারছেন না, তাদের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ‘নিরাপদ স্থানে অবস্থান’ করার, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার এবং আশপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকার।

সামরিক পদক্ষেপের হুমকি আরও জোরালো করে ট্রাম্প সোমবার গভীর রাতে ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ নতুন শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। যদিও প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে ইরান ইতিমধ্যে ব্যাপক মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় এবং একটি বড় তেল উৎপাদক দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই পদক্ষেপ বাস্তবের চেয়ে প্রতীকী প্রভাবই বেশি ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস সাড়া দেয়নি। নিউইয়র্কে জাতিসংঘে ইরানের মিশনও ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরানের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত।

ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে। রোববার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারে এবং তিনি ইরানের বিরোধীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছেন বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত তারা ৬৪৬ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১৩ জন সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৭ জন পথচারী ছিলেন। সংগঠনটি আরও ৫৭৯টি প্রতিবেদিত মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ১০ হাজার ৭২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এইচআরএএনএ জানায়, সোমবার তারা তেহরানের বেহেশত-এ-জাহরা কবরস্থান থেকে প্রতিবেদন ও ভিডিও পেয়েছে, যেখানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ‘কবরস্থানে জড়ো হয়ে প্রতিবাদী স্লোগান’ দিচ্ছিলেন। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানিটা আনন্দ এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘কানাডা ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে’ এবং অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একযোগে ‘দমনপীড়নের নিন্দা জানাচ্ছে, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যবহারের, যার ফলে অপ্রয়োজনীয় প্রাণহানি ঘটেছে।’

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্পের সামনে থাকা বহু বিকল্পের মধ্যে বিমান হামলাও একটি হলেও ‘প্রেসিডেন্টের জন্য কূটনীতি সব সময়ই প্রথম বিকল্প।’ তিনি বলেন, ‘ইরানি শাসনব্যবস্থা প্রকাশ্যে যা বলছে, প্রশাসন ব্যক্তিগতভাবে যে বার্তা পাচ্ছে তা তার থেকে একেবারেই ভিন্ন এবং প্রেসিডেন্ট সেই বার্তাগুলো খতিয়ে দেখার আগ্রহ রাখেন।’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তেহরান ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত ধারণাগুলো পর্যালোচনা করছে, যদিও সেগুলো ‘যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’ ইরান সরকার বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের কোনো সরকারি সংখ্যা প্রকাশ করেনি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর দিকেই বেশি নজর দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে তথ্যপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। তবে দেশের ভেতরের তিনজন সূত্র জানিয়েছেন, ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট সেবার মাধ্যমে এখনো কিছু ইরানি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন। ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় সোমবার জানায়, তারা ‘সন্ত্রাসী’ দলগুলোকে আটক করেছে, যারা ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের হত্যা, মসজিদে অগ্নিসংযোগ এবং সামরিক স্থাপনায় হামলার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সোমবার তেহরানের এঙ্গেলাব স্কয়ারে বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ইরানিরা চারটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে, ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ এবং আজ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।’

পরিস্থিতি ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে আরাগচি সোমবার বলেন, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ৫৩টি মসজিদ ও ১৮০টি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভের ব্যাপকতা সত্ত্বেও শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক বাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনীতে বিভক্তির কোনো লক্ষণ নেই। বিক্ষোভকারীদেরও কোনো সুস্পষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। বিরোধী পক্ষ বিভক্ত।

ট্রাম্প রোববার বলেন, ইরান তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করেছে। জুনে ১২ দিনের এক যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালায়। তিনি এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, ‘একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তবে বৈঠকের আগেই কী ঘটছে তার কারণে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।’

এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ট্রাম্প মঙ্গলবার ইরান বিষয়ে বিকল্পগুলো নিয়ে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এসব বিকল্পের মধ্যে রয়েছে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা এবং সরকারবিরোধী সূত্রগুলোকে অনলাইন সহায়তা দেওয়া। সামরিক স্থাপনায় হামলা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এর কিছু ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত।

সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত অবস্থায় থাকা ইরানের শেষ শাহর পুত্র রেজা পাহলভি ট্রাম্পকে ‘আরও দ্রুত’ হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্টকে শিগগির একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ পাহলভি ইরানিদের বিক্ষোভে উৎসাহ দিয়ে আসছেন এবং নিজেকে দেশের সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

গালিবাফ ওয়াশিংটনকে ‘ভুল হিসাব’ না করার সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলি—ইরানের ওপর হামলা হলে দখলকৃত ভূখণ্ডগুলো (ইসরায়েল)সহ যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত