Ajker Patrika

ইউক্রেন যুদ্ধ আরও তীব্র করার প্রস্তুতি পুতিনের—দাবি পশ্চিমা গোয়েন্দাদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইউক্রেন যুদ্ধ আরও তীব্র করার প্রস্তুতি পুতিনের—দাবি পশ্চিমা গোয়েন্দাদের
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র করার এবং ইউরোপে কিয়েভের মিত্র দেশগুলোর ওপর হাইব্রিড হামলা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনটাই দাবি পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। তাঁরা মনে করছেন, এই সপ্তাহান্তে রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর দেশটি একটি ‘গোপন বা নীরব সেনা সমাবেশ’ শুরু করার ভিত্তি তৈরি করছে। এই নির্বাচনের পর হাজার হাজার রুশ নাগরিককে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হতে পারে।

পশ্চিমা একটি দেশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমরা যা দেখছি, তা হলো এমন প্রশাসনিক প্রস্তুতি, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এটি করা সম্ভব হয়।’ এদিকে ইউরোপের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিমের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনের হাইব্রিড যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, পুতিন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি—ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর ১৫ লাখ সদস্য হতাহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৫ লাখ নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। তবে এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় অর্থবহ শান্তি আলোচনায় যাওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে বড়সংখ্যক সেনা প্রত্যাহারের কথা বিবেচনা করছে বলে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, পেন্টাগন ইউরোপ থেকে ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সামরিক বিমান, জাহাজ ও অস্ত্রও মহাদেশটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র এসব খবর অস্বীকার করেছে। তবে সামরিক জোট ন্যাটোর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার শুক্রবার দিনের শেষভাগে পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন সেনা মোতায়েনের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে সামরিক জোটটি। ইউরোপের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ন্যাটোর ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আরও সমন্বিত এবং ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে ওঠা অভিযানের পূর্বাভাস হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। এই ধরনের অভিযান নির্বাচন শেষ হওয়ার পর শুরু হতে পারে।

পুতিন যদি সেনা সমাবেশের নির্দেশ দেন, তাহলে এর উদ্দেশ্য শুধু ইউক্রেনে সেনা পাঠানো নাও হতে পারে। ইউরোপকেও এর লক্ষ্য করা হতে পারে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে ন্যাটোর সঙ্গে সংলগ্ন এলাকায় নতুন ঘাঁটিতে সেনা মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে কর্মকর্তারা মনে করছেন।

গতকাল শুক্রবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ মাখোঁ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে সম্ভাব্য নাশকতা থেকে রক্ষার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী দোনাল্দ তুস্ক সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করছে। তার দাবি, মস্কো এসব ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনাজনিত’ বলে বর্ণনা করার পরিকল্পনা করছে, যাতে ন্যাটো জোটকে পরীক্ষা করা যায়।

৩ লাখ সেনা মাঠে নামানোর সম্ভাবনা

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এর আগে দাবি করেছিলেন, তাঁর দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে—মস্কো আরও ৩ লাখ সেনা মাঠে নামানোর পরিকল্পনা করছে। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়ার কাছে নতুন করে ৩ লাখ সেনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আছে কি না। তাদের মতে, ‘খুব বড় পরিসরে প্রকাশ্য ম্যাস মোবিলাইজেশন বা গণমোতায়েন’ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা প্রচুর পরিমাণে যাকে গোপন সেনা সমাবেশ বলি, তা দেখতে পাচ্ছি এবং চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগ বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত প্রচেষ্টাও চলছে।’

এর মধ্যে বিচার শুরুর অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা, ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদেরও সেনাবাহিনীতে নিয়োগের চেষ্টা রয়েছে বলে তিনি জানান।

শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানায়, ক্রেমলিনের ভেতরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও বড় পরিসরে সেনা সমাবেশের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি রাশিয়ার কিছু নথির বরাত দিয়ে বলেছে, দেশটির নিয়োগকেন্দ্রগুলোতে তৎপরতা চলছে। একই সঙ্গে কিছু রুশ নাগরিক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ এড়াতে অর্থ ও সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও নথিগুলোতে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রাশিয়ার কারণে ইউরোপের জন্য বাড়তে থাকা হুমকি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাখোঁ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপীয়দের এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি আরও তীব্র হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো আমাদের ভয় দেখানো এবং ইউক্রেনকে সমর্থনের প্রচেষ্টা ভেঙে দেওয়া। এর ফল হবে ঠিক উল্টো। আমরা ভয় পাইনি, কারণ আমরা জানি, আজ এবং আগামীকাল আমাদের নিরাপত্তা ইউক্রেনের ওপর নির্ভর করছে।’

এদিকে মস্কো সতর্ক করে বলেছে, ইউক্রেনে ব্রিটিশ কোনো স্থাপনা যদি রাশিয়ার বিরুদ্ধে দূরপাল্লার হামলায় সহায়তা করার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পুতিনের চার বছর আগে শুরু করা হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইউক্রেনকে ব্রিটেনের সমর্থনের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কোতে ব্রিটেনের ডেপুটি হেড অব মিশন দানায়ে ধোলাকিয়াকে তলব করে।

ব্রিটিশ এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে সতর্ক করে বলা হয়, ব্রিটেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া ‘প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা’ নিতে পারে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এর আগে দেওয়া একই ধরনের হুমকির সঙ্গে এই সতর্কবার্তার মিল রয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এই তলবকে ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার বর্বর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যকে হেয় করার আরেকটি চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

চলতি মাসে ব্রিটেন ঘোষণা করেছে, এই শীতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে তারা ১০ কোটি পাউন্ড দেবে। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব–২০২৬’-এ স্বাক্ষর করেন। বিলটির নাম রাখা হয়েছে দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রয়াত সিনেটর এবং রাশিয়াবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত লিন্ডসে গ্রাহামের নামে, যিনি জুলাইয়ে মারা যান।

এই আইনের মাধ্যমে মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে।

‘শিকারি উন্মাদনা’

শুক্রবার মাখোঁ ফ্রান্সের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে তিন ঘণ্টার একটি বৈঠকে ফরাসি নেতাদের ডেকে পাঠান। বৈঠকের পর কয়েকজন রাজনীতিককে বিচলিত বলে জানা গেছে। র‍্যাডিক্যাল পার্টি অব দ্য লেফটের প্রেসিডেন্ট গিয়োম লাক্রোয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট এবং গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্রিফিং ও আলোচনা শেষে আমি মাত্র বেরিয়ে এসেছি। আমার ৫০ বছর বয়সে খুব কম সময়ই এমন মাথা ঘুরে যাওয়ার অনুভূতি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং বিশ্বকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেওয়া শিকারি উন্মাদনার কারণে এমন অনুভূতি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ফ্রান্স একটি ‘গুরুতর’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গণতন্ত্র, আমাদের দেশকে আজই এর মুখোমুখি হতে হবে এবং আগামীকালও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত