Ajker Patrika

শোক, শক্তি ও অপরাধবোধ: গাজায় যেভাবে বেঁচে আছে সব হারানো হাজারো এতিম শিশু

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
শোক, শক্তি ও অপরাধবোধ: গাজায় যেভাবে বেঁচে আছে সব হারানো হাজারো এতিম শিশু
গাজার দেইর আল–বালাহে ইসরায়েলি হামলায় নিহত আল জাজিরার সাংবাদিক আহমেদ উইশাহের মৃত্যুর পর শোকে ভেঙে পড়েন তাঁরই পরিবারের এক তরুণ সদস্য। ছবি: এএফপি

প্রতিদিন সকালে ১৩ বছর বয়সী জানা আল-মাতুক একাই ঘুম থেকে ওঠে। নিজের নাশতা নিজেই তৈরি করে, নিজেই কাপড় ধোয় পরিষ্কার করে এবং স্কুলের জন্য প্রস্তুত হয়। কিছুদিন আগেও এসব ছোটখাটো কাজ তার মা করে দিতেন। কিন্তু ইসরায়েলি এক সর্বগ্রাসী হামলার পর সব বদলে গেছে। জানা আল–মাকুতের এই দুনিয়ায় আর কেউই নেই। তাঁর পরিবারের একমাত্র সদস্য হিসেবে বেঁচে আছে সে।

জানা আল-মাতুক জানায়, ‘মা আমাদের ঘুম থেকে জাগাতেন, নাশতা বানিয়ে দিতেন, চুল আঁচড়ে দিতেন। এখন আমাকে সবকিছু নিজেকেই করতে হয়।’ কারণ, ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় তার পরিবারের সবাই নিহত হওয়ার পর একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে বেঁচে আছে জানা।

গাজা উপত্যকার জাবালিয়ায় এক আবাসিক ভবনে চালানো ওই ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন—তার বাবা আহমেদ, মা হেবা, যমজ বোন সাজা এবং ছোট দুই ভাই, আট বছর বয়সী হোসাম ও চার বছর বয়সী মোহাম্মদ। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে দুই বছরে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার পর বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা অন্য আত্মীয়স্বজন হারিয়ে একা হয়ে পড়া হাজারো শিশুর একজন জানা।

গাজার ২২ লাখ মানুষের বেশির ভাগই বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হারিয়েছে নিজেদের ঘরবাড়ি, স্কুল এবং জীবনের সেই স্বাভাবিক রুটিন, যা একসময় তাদের জীবনকে একটি কাঠামো দিত, স্থিরতা দিত। কিন্তু ইসরায়েলি গণহত্যামূলক আগ্রাসন গাজার একটি প্রজন্মকে শোক, বাস্তুচ্যুতি এবং গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হতে বাধ্য করছে।

জানার বড় পরিবারের আরও ৩৫ সদস্য—যাদের মধ্যে চাচা-মামা ও চাচাতো–ফুপাতো ও খালাতো–মামাতো ভাইবোনরাও ছিলেন—ওই হামলায় নিহত হন। সেদিন রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ায় জানা রাস্তার ওপারে তার দাদির বাড়িতে ঘুমিয়েছিল। এ কারণেই সে বেঁচে যায়। ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে বিস্ফোরণে যখন পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে, তখন সে দৌড়ে বাইরে যায়।

জানা স্মরণ করে বলে, ‘আমাদের বাড়িটাই আর ছিল না। ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। আমি বারবার মা-বাবাকে ডাকছিলাম। ধ্বংসস্তূপের ওপর বসে তাদের ডাকছিলাম। কেউ সাড়া দিচ্ছিল না।’

একা বেঁচে থাকার অপরাধবোধ

এরপর কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সকালে জানা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িটির ধ্বংসস্তূপে ফিরে যেত। হারিয়ে যাওয়া পরিবারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি না, তা খুঁজত। ধ্বংসস্তূপ থেকে রক্তমাখা কম্বল তুলে নিয়ে সে সেগুলো জড়িয়ে ধরত, চুমু দিত। পরে আত্মীয়রা তাকে বিপজ্জনক জায়গা থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতেন। জানা বলেছে, ‘আমার মনে হতো, আমি যদি তাদের সঙ্গে থাকতাম, ভালো হতো। ভাবতাম, আমি যদি তাদের সঙ্গে মারা যেতাম, তাহলে হয়তো শান্তি পেতাম।’

গাজায় জানার মতো বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে এমন অপরাধবোধ খুবই সাধারণ বলে জানিয়েছেন মনোবিজ্ঞানী সিরিন আল-আবসি। তিনি জানার মতো বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২৯ বছর বয়সী আল-আবসি বলেন, ‘তারা সবসময় মনে করে, তারা যেন অপরাধী। তারা ভাবে, ‘আমি কেন বেঁচে গেলাম, অথচ তারা চলে গেল? আমি তাদের রক্ষা করতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘যদিও যুক্তি দিয়ে তারা জানে, যা ঘটেছে তার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তারপরও তারা যে পরিমাণ যন্ত্রণা সহ্য করেছে, তাদের অনুভূতি সেই যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’

এখন জানা তার নানাবাড়িতে দাদা-দাদির সঙ্গে একটি তাঁবুতে থাকে। বাস্তুচ্যুতির কারণে তার আগের জীবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে জানা ও তার যমজ বোন সাজা ছিল অবিচ্ছেদ্য। জানা মৃদু হেসে স্মরণ করে বলে, ‘আমরা একই ধরনের পোশাক পরতাম। আমাদের একজন যদি অন্যরকম কিছু পরত, তাহলে আমরা মন খারাপ করতাম। সে শুধু আমার যমজ বোন ছিল না, সে ছিল আমার জীবনের সঙ্গী।’

‘আমি কাঁদতেও পারিনি’

গাজায় ফিলিস্তিনি সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আন্ডারসেক্রেটারি রিয়াদ আল-বিতার জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে ৬৮ হাজারের বেশি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক তাদের পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ৭৫ হাজারের বেশি শিশু এক বা উভয় মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়েছে।

এই পরিস্থিতি এত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, গাজার চিকিৎসাকর্মীরা এমন রোগীদের বোঝাতে ‘ডব্লিউসিএনএসএফ’ (WCNSF) সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করছেন। এর অর্থ হলো ‘Wounded Child, No Surviving Family’, অর্থাৎ ‘আহত শিশু, যার পরিবারের কেউ জীবিত নেই।’

১৮ বছর বয়সী দিমা জুনিনাও এমন একজন। সে গাজা সিটিতে থাকে। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে পাশের একটি ভবন ধসে তাদের বাড়ির ওপর পড়ে। ওই ঘটনায় তাঁর বাবা আহমেদ, মা নূর এবং তিন ছোট ভাই আনাস, বারাআ ও ছয় বছর বয়সী মুফিদ নিহত হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি দরজা তাঁকে আড়াল করে রাখায় দিমা বেঁচে যায়। কয়েক ঘণ্টা ধরে সে বিশ্বাস করেছিল, তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরাও হয়তো বেঁচে আছেন।

চিকিৎসকেরা তাঁর মাথার ক্ষত চিকিৎসা করছিলেন। একই সময় সে উদ্ধারকারীদের কাছে পরিবারের খবর জানতে বারবার অনুরোধ করছিল। দিমা বলেন, ‘আমি বারবার বলছিলাম, দয়া করে আমার মা-বাবা আর ভাইদের বের করে আনুন।’ এরপর ভোর হলে আত্মীয়রা তাঁকে জানান, তাঁর পরিবারের সবাই নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কাঁদতেও পারিনি। এখনো মনে হয়, তারা দরজা দিয়ে হেঁটে ঘরে ঢুকবে।’

তাঁর আশপাশের অনেক মানুষের মতো দিমা নিজেকে খুব কমই পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। সে মানুষের করুণা পেতে পছন্দ করে না। তিনি বলেন, ‘আমি চাই না, আমি এতিম বলে মানুষ আমার সঙ্গে অন্যরকম আচরণ করুক।’

সহানুভূতিও কখনো কখনো তার জন্য বেদনাদায়ক স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সহপাঠীরা কখনো না ভেবেই তাঁর মায়ের কথা বলে ফেলে। শিক্ষকেরা মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের স্কুলে মা-বাবার কাউকে নিয়ে আসতে বলেন। এক ইংরেজি শিক্ষক তাঁর পরিস্থিতি জানার পরও একদিন ক্লাসে অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত থাকার পর তাঁকে মাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে ফিরতে বলেছিলেন। দিমা বলল, ‘কথার মাঝখানে গিয়ে তিনি বিষয়টি মনে করতে পেরেছিলেন।’

এরপর সে আর ওই শিক্ষকের ক্লাসে ফিরে যায়নি। বরং এমন কিছু শিক্ষককে সে খুঁজে পেয়েছে, যারা তাঁর শোককে প্রদর্শনীর মতো না বানিয়ে নীরবে তাঁকে সেই শোক বহন করার জায়গা দিয়েছেন।

শক্তি ও শোক

এখন দুই কিশোরীকেই এমন দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, যা একসময় তাদের মা-বাবারা সামলাতেন। জানা স্কুলে যাওয়ার আগে চা বানানোর কথা বলে, একা একা পড়াশোনা করার কথা বলে। সে শক্ত থাকার চেষ্টা করে, কারণ তাঁর মা-বাবা সবসময় তাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতেন।

দিমা বলেছে, সে এখন যেন ‘এক শরীরে পাঁচজন মানুষ’ হয়ে গেছে। তাঁর বাবার করা সব দায়িত্ব এবং মায়ের সামলানো সব কাজও এখন তাঁকে করতে হয়। সে বলল, ‘যুদ্ধ আমার ব্যক্তিত্বকে আরও শক্ত করেছে। শক্ত হতে আমাকে বাধ্য করেছে।’ কিন্তু শক্ত হয়ে ওঠা মানেই শোক মুছে যাওয়া নয়। জানা এখনো ভুল করে সহপাঠীদের তাঁর যমজ বোনের নামে ডেকে ফেলে। কখনো কখনো পেন্সিল নেওয়ার সময় তাঁর মনে হয়, সাজা পেন্সিলটি বোনের হাতে তুলে দেবে।

মনোবিজ্ঞানী আল-আবসি জানিয়েছেন, জানা ও দিমার মতো শিশু-কিশোরীদের যে মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার কারণে তাঁরা অন্যদের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে অথবা হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের কথা মনে করিয়ে দেয় এমন মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘সেটা অবশ্যই ওই ব্যক্তির চেহারার কারণে হতে হবে এমন নয়; কোনো একটি অনুভূতিও হতে পারে। তখন তারা ওই ব্যক্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে।’ এর বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। আবসি বলেন, ‘এটি বিচ্ছিন্নতাও তৈরি করতে পারে, যখন আপনি নিজেকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখতে চান।’

আল-আবসি বলেন, পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্যদের মানসিক আঘাত আরও গভীর হয়, কারণ তাঁরা হারানো প্রত্যেক মানুষের শোক একসঙ্গে বহন করে। তিনি বলেন, ‘একজন, দুজন, তিনজন বা তারও বেশি মানুষকে হারানোর ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর এটি এক ধরনের জটিল মানসিক আঘাত তৈরি করতে পারে।’

স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা

সবকিছুর পরও দুই কিশোরীই পড়াশোনা শেষ করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুদ্ধের আগে জানার স্কুলের গড় নম্বর ছিল ৯৬ শতাংশ। সে তার যমজ বোনের সঙ্গে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার স্বপ্ন দেখত। এখন পর্যন্ত কোরআনের ৩০টি পারার মধ্যে ৯টি পারা মুখস্থ করেছে সে। আরও মুখস্থ করার আশা রাখে।

দিমা সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান পড়ার কথা ভাবছে। মানুষ প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করে, সে ভবিষ্যতে কী হতে চায়। কিন্তু এখন তাঁর কাছে এর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। তিনি বলেন, ‘আমি আপাতত শুধু স্কুল শেষ করতে চাই।’ কিছুক্ষণ থেমে সে আবার বলল, ‘আমি আমার পরিবারের আত্মার শান্তির জন্য একটি পানির কূপ তৈরি করতে চাই, যা সদকায়ে জারিয়া বা চলমান দান হিসেবে থাকবে।’

তাদের কী চাওয়া, জানতে চাইলে দুই কিশোরীই এমন কিছু চাওয়ার কথা বলেছে, যা বিশ্বের অন্য জায়গার শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই পেয়ে থাকে। জানা বলল, ‘একটি বাড়ি, একটি স্কুল, এমন একটি জায়গা যেখানে আমরা ভয় ছাড়া বসবাস করতে পারি। আমাদের শেখার অধিকার আছে। আমাদের খেলার অধিকার আছে। আমাদের স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে।’

দিমার চাওয়া আরও সহজ। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে একজন মানুষ হিসেবে আচরণ করুন। শুধু সেই মেয়ে হিসেবে নয়, যার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে।’

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত