Ajker Patrika

‘বিদ্রোহী’ শিবিরে এবার মমতা-ঘনিষ্ঠ সায়নী ঘোষ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ১৭: ৫০
‘বিদ্রোহী’ শিবিরে এবার মমতা-ঘনিষ্ঠ সায়নী ঘোষ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন সাবেক অভিনেত্রী সায়নী ঘোষ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই তৃণমূল কংগ্রেসে (টিএমসি) এক নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দলটির অন্যতম পরিচিত মুখ এবং যাদবপুরের সংসদ সদস্য সায়নী ঘোষ এবার দলটির ভেতরে তৈরি হওয়া একটি ‘বিদ্রোহী’ গ্রুপে যোগ দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

তৃণমূলের অন্তত ২০ জন সংসদ সদস্য লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠি লিখে আলাদা একটি সংসদীয় ব্লক গঠনের আবেদন জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) জোটকে সমর্থন জানাতে পারে।

দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্ষীয়ান লোকসভা সংসদ সদস্য কাকলী ঘোষ দস্তিদার। গত সোমবার এই ২০ সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠানোর পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে ভাঙনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সায়নী ঘোষ ইতিমধ্যে কাকলী ঘোষ দস্তিদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্রোহী নথিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি বর্তমানে কলকাতায় নেই এবং ধারণা করা হচ্ছে, দিল্লিতে অবস্থানরত বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তিনিও সেখানে যোগ দিয়েছেন।

এদিকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত আরেক সংসদ সদস্য মালা রায়ও আকস্মিকভাবে দিল্লিতে গিয়ে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সায়নী ঘোষের এই সিদ্ধান্ত কেন নজিরবিহীন

তৃণমূলের রাজনীতিতে সায়নী ঘোষের এই আকস্মিক দলবদলের আভাস রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চমকে দিয়েছে। কারণ, সায়নীকে এত দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম কট্টর ও সোচ্চার সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সম্প্রতি তাঁকে দলের যুব শাখার সভাপতি পদেও মনোনীত করা হয়েছিল।

বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারকালে এক সাক্ষাৎকারে সায়নী বলেছিলেন, ‘দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) জিতলে বাংলা জিতবে।’ তিনি কোনো অবস্থাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে যাবেন না বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এমনকি মমতাকে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেখতে চান বলে প্রচারণা চালিয়েছিলেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে সায়নী ঘোষের এই অবস্থান পরিবর্তন আরও বেশি বিস্ময়কর ঠেকছে তাঁর দীর্ঘদিনের তীব্র বিজেপি-বিরোধী ভূমিকার কারণে। বিগত বছরগুলোতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের নারী সংরক্ষণ বিলসহ নানা নীতির কড়া সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব এবং বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগও এনেছিলেন তিনি।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর সায়নী দাবি করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরেছেন ভোট চুরি ও জালিয়াতির কারণে, জনগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেনি। তিনি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা হারিনি, ভোট লুট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো হয়েছে। ২০২৯ সালে দেশের মানুষ এবং ২০৩১ সালে বাংলার মা-মাটি-মানুষ এর উপযুক্ত জবাব দেবে।’

সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সায়নীর এই বিদ্রোহী শিবিরের অংশ হওয়া এবং এনডিএ জোটকে পরোক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতিকে অনেকে তাঁর রাজনৈতিক সুরক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

তৃণমূলের এই সংকট কেবল সায়নী বা কাকলী ঘোষ দস্তিদারের বিদ্রোহেই সীমাবদ্ধ নয়; সম্প্রতি দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী সুস্মিতা দেবও তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের পর তিনি আসামের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে ‘দিকনির্দেশনা’ নিতে সাক্ষাৎ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

সায়নী ঘোষ বরাবরই তাঁর ধারালো বক্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রচারে আলোড়ন সৃষ্টি করার জন্য পরিচিত। নির্বাচনের প্রচারে তাঁর একটি গান, যার কথায় ‘বক্ষে আমার কাবা, নয়নে মদিনা’ কথাটি ছিল, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের বিপর্যয় এবং একের পর এক শীর্ষ নেতার দল ত্যাগের এই ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং তাঁর সংসদীয় শক্তি ধরে রাখেন, সেটাই দেখার বিষয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত