Ajker Patrika

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন: প্রথম দফায় রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোটদান, কিসের ইঙ্গিত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ২৪
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন: প্রথম দফায় রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোটদান, কিসের ইঙ্গিত
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোটার উপস্থিতি কিসের বার্তা দিচ্ছে? ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে তো বটেই, এমনকি স্বাধীন ভারতের বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসেও এক বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল এই রাজ্য। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ রাজ্যে তো বটেই, সারা দেশে এই পরিসংখ্যান ‘নজিরবিহীন’। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখনো পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ভোটদানের সর্বোচ্চ হার এটাই। এর জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে রাজ্যের মানুষকে ‘স্যালুট’ জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফায় ভোট পড়েছে ৯২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। উত্তরবঙ্গ ও রাঢ়বঙ্গের জেলাগুলোতে মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বিস্ময়কর।

কোচবিহার: ৯৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ (সর্বোচ্চ)।

দক্ষিণ দিনাজপুর: ৯৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

উত্তরবঙ্গ: জলপাইগুড়ি, মালদহ এবং উত্তর দিনাজপুরে ভোটের হার ৯৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

রাঢ়বঙ্গ: বীরভূমেও ৯৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে।

পাহাড়: দার্জিলিং ও কালিম্পঙে ভোটের হার তুলনামূলক কম, ৯০ শতাংশের নিচে।

অন্যান্য জেলা: বাকি জেলাগুলোতেও ভোটের হার ৯০-এর গণ্ডি পেরিয়ে গেছে।

২০১১ সালের ‘পরিবর্তনে’র ভোট (৮৪ দশমিক ৩৩%) এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনকেও (৮২ দশমিক ২%) ছাপিয়ে গেছে ২০২৬ সাল।

নজিরবিহীন ভোটদানের নেপথ্যে কি এসআইআর আতঙ্ক?

অনেকের মতে, এই বিপুল ভোটদানের নেপথ্যে রাজনৈতিক চেতনার চেয়েও বেশি কাজ করেছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। প্রথম দফায় যে আসনগুলোতে ভোট হয়েছে, সেখানে ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫৩ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে।

২০২১ সালে এই ১৫২টি আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩ দশমিক ৭৮ কোটি। সে বার ৮৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে ৩ দশমিক ১৪ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালে এসআইআরের পর মোট ভোটারের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬০ কোটি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ভোট দিয়েছেন ৩ দশমিক ২৪ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, মোট ভোটার কমলেও ভোটদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই

ভোট না-দিলে তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে এবং নাগরিকত্ব সংকটে পড়তে হতে পারে—এই আতঙ্কে বহু মানুষ বুথমুখী হয়েছেন। হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনে কয়েক দিন ধরেই অন্য রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভাড়ার টাকা জমিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। শুধু দরিদ্র মানুষই নন, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্তাদেরও এবার লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বলতে শোনা গেছে, ‘নাম বাদ যাওয়ার ভয়ে এবার ভোটটা দিতেই হলো।’

এদিকে এই বিপুল ভোট কার বাক্সে গেল, তা নিয়ে যুযুধান দুই পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন।

শাসকদল তৃণমূলের মতে, এসআইআরের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানিকে হাতিয়ার করে মানুষ বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। ভিন রাজ্য থেকে গাঁটের কড়ি খরচ করে আসা শ্রমিকেরা এই জবরদস্তিমূলক সংশোধনীর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন বলে তাদের দাবি। তারা ২০১১ সালের বিহারের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছে, এসআইআরের পর ভোটের হার বাড়লে সাধারণত শাসকদলেরই প্রত্যাবর্তন ঘটে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দল বিজেপির দাবি, এই বিপুল ভোট পরিবর্তনের পক্ষে। মানুষ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যাতে তাঁদের আর কাজের অভাবে রাজ্য ছাড়তে না হয়। তাঁরা ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ দিয়ে বলছে, সে বারও ভোটদানের হার রেকর্ড গড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান হয়েছিল।

বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলা

অতীতের তুলনায় এবার ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু জায়গায় উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মুর্শিদাবাদের ডোমকলে সিপিএম বনাম তৃণমূল সংঘর্ষে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায়। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার এবং আসানসোল দক্ষিণে অগ্নিমিত্রা পালের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।

বীরভূমের খয়রাশোলে ইভিএম বিকল হওয়ার কারণে ভোট থমকে থাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের বচসা হয়, সেখানে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

সাগরদীঘির তৃণমূল প্রার্থী বাইরন বিশ্বাস নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ভোট দিতে পারেননি। অন্যদিকে, বীরভূমের বোলপুরে চিত্রকর নন্দলাল বসুর নাতি সুপ্রবুদ্ধ সেন ও তাঁর স্ত্রীকে প্রথমে বাধা দেওয়া হলেও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাঁরা বিকেলে ভোট দিতে সক্ষম হন।

রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা (সিইও) মনোজকুমার আগারওয়াল জানিয়েছেন, ভোটাররা সর্বত্র নির্ভয়ে ভোট দিয়েছেন। বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে বড় কোনো অশান্তি হয়নি। এই দফায় ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৫৭০ জনকে আগাম গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুনর্নির্বাচনের বিষয়ে রিপোর্ট পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

আগামী ৪ মে ফলাফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত এই ‘নজিরবিহীন’ ভোট সরকার পরিবর্তনের পক্ষে গেল নাকি কেন্দ্রে আসীন বিজেপির নানা নিবর্তনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে গেল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ইসহাক, শেরেবাংলার নাতনি ফ্লোরা

শাহবাগ থানা চত্বরে ডাকসুর দুই নেতাকে মারধর

রাজশাহী-ঢাকা রুটে এসি বাসের ভাড়া বাড়ল ২০০ টাকা

শাহবাগ থানা চত্বরে ধাক্কা–ধাক্কির শিকার কয়েকজন সাংবাদিক

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে গণভোটের প্রচারের কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত