Ajker Patrika

আফগানিস্তানে বিয়ে থেকে বাঁচতে ট্যাক্সিতে পালান আলিয়া, পারেননি শামা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আফগানিস্তানে বিয়ে থেকে বাঁচতে ট্যাক্সিতে পালান আলিয়া, পারেননি শামা
তালেবান শাসনে এভাবেই আপাদমস্তক ঢেকে চলাফেরা করেন আফগান নারীরা। ছবি: এএফপি

আফগানিস্তানের দাইকুন্দি প্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কাবুলের পথে রওনা দিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী আলিয়া। পরিবারের কাছে তিনি বলেছিলেন, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেটি ছিল একটি অজুহাত। আসল কারণ ছিল—বিয়ের হাত থেকে পালানো। কারণ তাঁর পরিবার তাঁকে এমন এক সমাজে বিয়ে দিতে চাইছিল, যেখানে মেয়েদের শিক্ষা প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।

বিবিসি জানিয়েছে, সেদিন ট্যাক্সিতে চড়ে আলিয়া ও তাঁর এক নারী আত্মীয়া কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। তালেবান শাসনের নিয়ম মেনে তাঁদের শরীর ছিল পুরোপুরি ঢাকা, শুধু চোখ দুটি খোলা। আফগানিস্তানে পুরুষ অভিভাবক ছাড়া কোনো নারী দীর্ঘ ভ্রমণ করলে তালেবানের নজরদারি ও শাস্তির ঝুঁকি থাকে। তবু তাঁরা সাহস করে রওনা হন। সৌভাগ্যক্রমে পথে কোনো চেকপোস্টে তাঁদের থামানো হয়নি।

কাবুলে পৌঁছে আলিয়া ভর্তি হন একটি ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রে। আফগানিস্তানে মাধ্যমিকের পর মেয়েদের জন্য এখন এই ধরনের বেসরকারি স্বল্পমেয়াদি কোর্স বা মাদ্রাসাই শিক্ষার একমাত্র সুযোগ। তবে এগুলো কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার বিকল্প নয়।

২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দেশটির লাখ লাখ কিশোরী শিক্ষা, স্বপ্ন ও পেশাগত ভবিষ্যৎ হারিয়েছে। অনেকের জীবন এখন একটিমাত্র পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, আর সেটি হলো বিয়ে।

আলিয়ার পরিবার তুলনামূলকভাবে সচ্ছল। তারা মেয়ের পড়াশোনার ইচ্ছার বিরোধিতা করেনি। বরং এখনো তাঁর ইংরেজি কোর্সের খরচ দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা তাঁদেরও অসহায় করে তুলেছে।

আলিয়া বলছিলেন, ‘একসময় বাবা-মা আমাকে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দিতেন। এখন তারা বলেন, যেহেতু আমি স্কুলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছি না, কাজও করতে পারছি না—তাই বিয়েই আমার জন্য ভালো।’

ইতিমধ্যে আলিয়ার একাধিক বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আলিয়ার ভয়, হয়তো একসময় তাঁকে রাজি হতে হবে। তবু দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরিবার যদি জোর না করে, আমি শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত অপেক্ষা করব। বিয়ের বিরুদ্ধে লড়ব।’

কিন্তু আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতা হলো—সবাই আলিয়ার মতো প্রতিরোধ করতে পারে না।

কাবুলের পশ্চিমের এক ছোট ঘরে বাস করেন শামা। চার বছর আগে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে, তাঁকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। এখন তিনি দুই কন্যাসন্তানের মা। অথচ তাঁর স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার।

শামা বলেন, ‘তালেবান ক্ষমতায় না এলে এত দিনে হয়তো আমার পড়াশোনা প্রায় শেষ হয়ে যেত।’

শামার মা কামিলা স্বামীর মৃত্যুর পর পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে মেয়েদের পড়িয়েছেন। কিন্তু মেয়েকে অবিবাহিত রেখে সমাজ ও তালেবানের চাপ মোকাবিলা করার সাহস পাননি।

কামিলা বলেন, ‘আমি ভয় পেতাম, তারা প্রশ্ন করবে কেন মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছি না। আমি নিজে অশিক্ষিত। অন্ধ মানুষের মতো জীবন কাটাই। কিন্তু চেয়েছিলাম আমার মেয়েরা যেন শিক্ষিত হয়।’

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে বর্তমানে প্রতি চারজনের তিনজন মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। আর যদি ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে, তাহলে ২০ লাখের বেশি মেয়ে প্রাথমিকের পর আর কোনো শিক্ষা পাবে না।

শামা বলেন, ‘একজন নারীর একমাত্র স্বপ্ন স্বামী পাওয়া নয়। তার আগে নিজের পায়ে দাঁড়ানো দরকার। কিন্তু আমি সেই সুযোগ পাইনি।’

শামা একসময় বিয়ের বহু প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ পড়াশোনা ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সিনেমায় কোনো নারী চরিত্রকে পড়াশোনা বা কাজ করতে দেখলেও তাঁর কষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘আমি যেন ঘরের ভেতর আটকা পড়ে আছি। এখন বেঁচে আছি শুধু সন্তানদের জন্য।’

শামার ১৮ বছর বয়সী বোন নোরাও একই পরিণতির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। তিনি আবার স্কুলে ফিরতে চান। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, তালেবান শাসনে তা আর সম্ভব হবে না। নোরা বলেন, ‘প্রতিদিন আমরা অপেক্ষা করি—হয়তো ঘোষণা আসবে স্কুল খুলছে। কিন্তু সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেছে।’

তালেবান সরকার শুরুতে বলেছিল, নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে মেয়েদের স্কুল খুলে দেওয়া হবে। পরে তারা ধর্মীয় আপত্তির কথা বলে। এখন প্রায়ই তারা নীরব থাকে অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপর দায় চাপায়।

তালেবানের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত সম্প্রতি দাবি করেন, দেশে এখনো লাখো ছেলে ও মেয়ে পড়াশোনা করছে। তবে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সরাসরি কোনো জবাব দেননি।

অন্যদিকে তালেবান সরকার দাবি করছে, তারা নারীদের ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দিচ্ছে এবং জোরপূর্বক বিয়ে ঠেকাতে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। সম্প্রতি তারা এমন আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের নীরবতাকেও বিয়ের সম্মতি হিসেবে ধরা যেতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে আফগান নারীদের অনেকেই ধারণা করছেন, সারা বিশ্বের মানুষ তাদের দুর্দশা ভুলে গেছে। আলিয়া বলেন, ‘যদি আমাদের ভুলে না যেত, তাহলে এত দিনে কিছু একটা হতো।’

নিজের ভাগ্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নোরাও প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কেন আফগানিস্তানে জন্ম নিলাম?’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত