Ajker Patrika

বিতর্কিত লেখা নিয়ে ২০ বছর দিল্লিবাস, এবার কলকাতার আমন্ত্রণেই প্রত্যাবর্তন তসলিমার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বিতর্কিত লেখা নিয়ে ২০ বছর দিল্লিবাস, এবার কলকাতার আমন্ত্রণেই প্রত্যাবর্তন তসলিমার
বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক ও অধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই দশক ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে অবশেষে প্রিয় শহর কলকাতায় ফিরছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক ও অধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র সদনে মৌলবাদবিরোধী এক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

আজ মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলকাতায় ফেরার এই খবর নিশ্চিত করে তসলিমা লিখেছেন, ‘২০ বছর পর এক মুক্ত বাংলায় প্রত্যাবর্তন’। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় এই সফর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তসলিমা নাসরিনকে কলকাতায় ফিরিয়ে আনার এই উদ্যোগটি যৌথভাবে নিয়েছে ‘সেক্যুলার মিশন’, ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার্স’ (এইচআরবিএফ) নামক কয়েকটি সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুক্তচিন্তার সপক্ষে ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তসলিমা নাসরিনকে এই সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। কলকাতায় ১ আগস্টের এই অনুষ্ঠানে তসলিমার লেখা কবিতা আবৃত্তি, তাঁর সৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে গান এবং নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

এই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রখ্যাত প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য ও কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ওসমান মল্লিক এবং মোহিত রায় জানান, তসলিমা নাসরিনের পশ্চিমবঙ্গে আসার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা কখনই ছিল না, কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারগুলো কট্টরপন্থীদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে ভোটব্যাংকের রাজনীতির স্বার্থে তাঁকে কলকাতায় ঢুকতে দেয়নি। তবে রাজ্যে নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় এবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তসলিমার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন এবং তাঁর এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন।

১৯৯৪ সালে বিতর্কিত ‘লজ্জা’ উপন্যাসের জেরে বাংলাদেশে কট্টরপন্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। ইউরোপ-আমেরিকায় কয়েক বছর কাটানোর পর, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির টানে ২০০৪ সালে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু ২০০৭ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশের পর কলকাতার সংখ্যালঘু মৌলবাদী দলগুলো রাজপথে সহিংস আন্দোলন শুরু করে, যার ফলে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার অজুহাতে তসলিমা নাসরিনকে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করে এবং বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের জমানাতেও তসলিমার কলকাতায় ফেরার সমস্ত আবেদন ও চেষ্টা অলিখিতভাবে নাকচ করে দেওয়া হয়। এমনকি তসলিমার লেখার ওপর ভিত্তি করে তৈরি নাটকও থিয়েটার উৎসব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

ভারতে তাঁর দীর্ঘমেয়াদে থাকার আবাসিক পারমিট বা ভিসা নিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে এক দফায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হস্তক্ষেপে তা নবায়ন করা হয়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিজেপির এমপি শমীক ভট্টাচার্য রাজ্যসভায় তসলিমার কলকাতায় ফেরার সপক্ষে জোরালো দাবি তোলেন। অবশেষে দুই দশকের নির্বাসন কাটিয়ে নিজের দ্বিতীয় আবাসভূমি কলকাতায় প্রিয় পাঠকদের মাঝে তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তনকে রাজ্যের বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজ স্বাধীন মতপ্রকাশের লড়াইয়ের একটি বড় জয় হিসেবে দেখছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত