Ajker Patrika

তিব্বতে ক্লোন করা হচ্ছে ‘ইয়াক’—উঠেছে নৈতিকতার প্রশ্নও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
তিব্বতে ক্লোন করা হচ্ছে ‘ইয়াক’—উঠেছে নৈতিকতার প্রশ্নও
তিব্বতে একটি বুনো ইয়াক। ছবি: সিএনএন

তিব্বতের চার হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতার দুর্গম মালভূমিতে চলছে এক অভিনব বৈজ্ঞানিক প্রকল্প। তুষারঢাকা পাহাড়, তীব্র ঠান্ডা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন ক্লোন ইয়াক। এর লক্ষ্য হলো—আরও স্বাস্থ্যবান, দ্রুত বর্ধনশীল, অধিক উর্বর ও রোগ প্রতিরোধী ‘এলিট’ ইয়াকের একটি পাল গড়ে তোলা। তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে বিজ্ঞানী ও নীতিবিদদের মধ্যে নৈতিক বিতর্কও দেখা দিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন।

চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী—২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রথম সফল ক্লোন ইয়াক জন্ম নেয়। এটি ছিল একটি গৃহপালিত ইয়াকের জেনেটিক উপাদান ব্যবহার করে তৈরি ক্লোন। এরপর আরও ১০টি ক্লোন ইয়াক জন্ম নিয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ টির বেশি ‘এলিট’ ক্লোন ইয়াকের একটি পাল তৈরি করা।

প্রকল্পটির নেতৃত্বে থাকা ফাং শেংগুও বলেন, ‘এই সাফল্য দেখিয়েছে ক্লোনিং প্রযুক্তি এখন আর এককালীন সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি স্থিতিশীলভাবে বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।’

তিব্বতের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে ইয়াকের গুরুত্ব অপরিসীম। পশম, দুধ ও মাংসের পাশাপাশি কৃষিকাজেও ইয়াক ব্যবহার করেন স্থানীয় যাযাবর ও কৃষকেরা। বিশ্বে গৃহপালিত ইয়াকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থলের অবক্ষয় এবং জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণে প্রাণীটি নানা সংকটে পড়েছে।

অন্যদিকে, বুনো ইয়াকের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। গত ৩০ বছরে তাদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমেছে বলে জানিয়েছে ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি। বর্তমানে তিব্বত অঞ্চলে মাত্র ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার বুনো ইয়াক টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। বিশেষ করে ‘গোল্ডেন ওয়াইল্ড ইয়াক’ নামে পরিচিত একটি বিরল উপপ্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩০০-তে নেমে এসেছে।

গবেষকদের দাবি, ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত উৎকৃষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে ইয়াকের উর্বরতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়তে পারে। গৃহপালিত ইয়াকের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বুনো ইয়াক সংরক্ষণেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সালে মৃত গোল্ডেন ওয়াইল্ড ইয়াকের দেহ থেকে কোষ সংগ্রহ করে গবেষকেরা ক্লোন ভ্রূণ তৈরির কাজ শুরু করেন। তবে এখনো কোনো সফল বুনো ইয়াক ক্লোন জন্ম নেওয়ার খবর প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে, ক্লোনিং প্রকল্পটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রাণিচিকিৎসক ও বায়োএথিসিস্ট লিসা মোজেসের মতে, সংরক্ষণে ক্লোনিং ব্যবহারের যৌক্তিকতা থাকলেও পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—সফল ১১টি ক্লোন জন্মের আগে কতগুলো ব্যর্থ গর্ভধারণ, গর্ভপাত বা প্রাণীর মৃত্যু ঘটেছে, তা জানা যায়নি। একইভাবে ক্লোন ইয়াকের জিনগত বৈচিত্র্য কীভাবে বজায় রাখা হবে এবং প্রাণীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কী ধরনের নৈতিক তদারকি রয়েছে, সেই বিষয়েও পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সমালোচকদের মতে, পরিবেশ ধ্বংসের মূল কারণ—জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল নষ্ট হওয়া ও চোরাশিকার—সমাধান না করে শুধু ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে প্রাণী সংরক্ষণ দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। তবে অন্যদের যুক্তি, প্রচলিত সংরক্ষণব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রক্ষায় আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

ফলে তিব্বতের ‘সুপার-ইয়াক’ প্রকল্প একদিকে যেমন কৃষি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, অন্যদিকে প্রাণী কল্যাণ, জিনগত বৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপের সীমা নিয়ে নতুন করে তৈরি করছে এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত