Ajker Patrika

‘নাগরিকদের কি সরকারের দাস বানাতে চান?’— পুলিশকে বোম্বে হাইকোর্টের ভর্ৎসনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ১১: ০৩
‘নাগরিকদের কি সরকারের দাস বানাতে চান?’— পুলিশকে বোম্বে হাইকোর্টের ভর্ৎসনা
ফাইল ছবি

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে এক রাজনৈতিক কর্মীকে শহর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ায় মুম্বাই পুলিশের কঠোর সমালোচনা করেছেন বোম্বে হাইকোর্ট।

আদালত এই বহিষ্কারাদেশ বাতিল করার পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দিয়ে পুলিশ কি তাঁদের ‘সরকারের দাসে’ পরিণত করার চেষ্টা করছে?

ভারতের বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি মাধব জে জামদার এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে পুলিশকে মনে করিয়ে দেন যে তাঁরা জনগণের সেবক, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনুগত দাস নন। রায় দেওয়ার সময় আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করা ভারতের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত সমাজতান্ত্রিক ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়ার (এসডিপিআই) সাধারণ সম্পাদক ৪৯ বছর বয়সী সাইদ আহমেদ আবদুল ওয়াহিদ চৌধুরীকে ঘিরে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মুম্বাই পুলিশ একটি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে তাঁকে এক বছরের জন্য শহর থেকে বহিষ্কার (তড়িপার বা এক্সটার্নমেন্ট) করে।

পুলিশের দাবি ছিল, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ওয়াহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। ভারতের বহুল বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি), বাবরি মসজিদ এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ-সংক্রান্ত নানা ইস্যুতে মুম্বাই পুলিশের অনুমতি ছাড়াই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন ওয়াহিদ চৌধুরী।

পুলিশের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, ওই সব বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রতিবাদকারীরা ‘বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ’ এবং ‘অমিত শাহ মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছিলেন।

তবে সাইদ আহমেদ চৌধুরী শুরু থেকেই একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করে আসছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় পৌরসভা নির্বাচন থেকে তাঁকে দূরে রাখতে এবং গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতেই পুলিশ এই পদক্ষেপ নিয়েছিল।

ভারতে সাধারণত দাগি অপরাধী কিংবা সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের সাময়িকভাবে কোনো নির্দিষ্ট এলাকা থেকে দূরে রাখতে এই বিশেষ ও চরম আইনি অস্ত্রটি (এক্সটার্নমেন্ট বা বহিষ্কারাদেশ) ব্যবহার করা হয়।

ওয়াহিদ চৌধুরীর আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত সাধারণ প্রকৃতির এবং এগুলোর সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র এক মাসের কারাদণ্ড। এমন সাধারণ অভিযোগে কোনো নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া আইনসম্মত হতে পারে না।

অন্যদিকে রাজ্য সরকার পুলিশের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে যুক্তি দেয়, পুলিশ বারবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা সত্ত্বেও অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করার কারণেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

তবে এই যুক্তি নাকচ করে বিচারপতি মাধব জে জামদার তাঁর রায়ে বলেন, পুলিশের এই পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ এবং এর পেছনে কোনো বাস্তব আইনি ভিত্তি ছিল না। সাইদ আহমেদ চৌধুরী জননিরাপত্তা বা রাষ্ট্রের সম্পদের জন্য কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছিলেন—এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ পুলিশ আদালতে হাজির করতে পারেনি।

রায়ে আদালত ভারতের সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ (বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার) প্রসঙ্গ উল্লেখ করে।

বিচারপতি জামদার বলেন, শুধু সরকারের নীতিমালার সমালোচনা করার জন্য কোনো নাগরিকের এই পবিত্র অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির তৈরি করে।

আদালত পরিশেষে জোর দিয়ে মনে করিয়ে দেন যে শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত এবং সুস্থ বিতর্কই একটি কার্যকর ও সচল গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত