Ajker Patrika

ইরানে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত কুর্দিরাও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ২২: ১৪
ইরানে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত কুর্দিরাও
ছবি: এএফপি

ইরান-ইরাক সীমান্তঘেঁষা তুষারঢাকা পাহাড়ে, গোপন এক গুহার ভেতরে বসে তৈরি হচ্ছে এমন এক যুদ্ধের প্রস্তুতি—যা শুধু দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকেই নাড়া দিতে পারে। কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পেশমার্গা এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সুযোগ আর বিপদ—দুটোই সমান তীব্র।

গুহার ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে হঠাৎ এক উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন কক্ষ। সেখানে উপস্থিত পেশমার্গা যোদ্ধারা (নারী ও পুরুষ) তাদের স্বতন্ত্র পোশাকে প্রস্তুত। মূলত তারা ‘কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি’ বা পিজাক (পিজেএকে)-এর নেতা। বহু বছর ধরে তারা ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, চলমান সংঘাতের এই সময়টিতে তারা এখন ‘ট্রিগারে আঙুল রেখেছেন’। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য অভিযানে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান এবং গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের একটি কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করেছে। ইউরোপে বসবাসরত বহু ইরানি কুর্দিও সাম্প্রতিক সময়ে ফিরে আসছেন, মাতৃভূমির জন্য লড়াইয়ে অংশ নিতে।

তবে কুর্দিদের সম্ভাব্য এই অংশগ্রহণের ভেতরে রয়েছে গভীর দ্বিধা। একদিকে, কুর্দিরা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার; অন্যদিকে তাদের এই অংশগ্রহণ ইরানের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে, কুর্দিরা কি স্বায়ত্তশাসন চায়, নাকি আলাদা রাষ্ট্র—এই নিয়ে ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্সিয়ান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।

এই সন্দেহের প্রতিফলন দেখা যায় ইরানের নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভির বক্তব্যে। তিনি ইরানের শাসন ব্যবস্থার উৎখাত চাইলেও কুর্দিদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে তাদের সমালোচনা করেছেন। এর ফলে কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ইরানের শাসন বিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছে।

কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পিজাক বিশেষভাবে সংগঠিত ও অভিজ্ঞ। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি পাহাড়ি ঘাঁটি থেকে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তাদের আদর্শে রয়েছে নারীর সমতা, পরিবেশবাদ এবং স্থানীয় গণতন্ত্র। যোদ্ধাদের জন্যও রয়েছে কঠোর নিয়ম। তাদের মদ্যপান নিষিদ্ধ, ধূমপানেও নিরুৎসাহিত করা হয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাদের সীমিত রাখতে হয়। তাদের জীবন অনেকটা সন্ন্যাসীদের মতো শৃঙ্খলাপূর্ণ।

তবে পিজাকের একটি বড় সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর পেছনে রয়েছে আবদুল্লাহ ওচালানের সঙ্গে তাদের আদর্শিক সম্পর্ক। ওচালান কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-এর প্রতিষ্ঠাতা। তুরস্কের সঙ্গে পিকেকে-এর দীর্ঘ সংঘাতের কারণে এই সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই জটিলতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও অস্পষ্ট। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো কুর্দিদের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন, আবার হঠাৎ করে তাদের ইরানে প্রবেশের বিরোধিতা করেছেন। এই দ্বৈত অবস্থান কুর্দিদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করেছে। একইভাবে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কৌশলগত আগ্রহও এই অঞ্চলের অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী ইব্রিল-এ পৌঁছানোর পর দেখা যায়, এই অঞ্চল ইতিমধ্যেই এক অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইরানের ড্রোন হামলা এখানে প্রায় নিয়মিত ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে এসব হামলা কুর্দি ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হয়। এসব ঘাঁটিতেই পেশমার্গা যোদ্ধারা অবস্থান করছেন। ইরানের হামলার মুখে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষা না থাকায় তারা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

গুহার ভেতরে নিজের অস্ত্র হাতে একজন কুর্দি নারী। ছবি: এএফপি
গুহার ভেতরে নিজের অস্ত্র হাতে একজন কুর্দি নারী। ছবি: এএফপি

কুর্দিদের ইতিহাস তাদের সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রায় তিন কোটি কুর্দি পাঁচটি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে এবং বহু দশক ধরে তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে আসছে। ১৯৪৬ সালে ইরানের উত্তর-পশ্চিমে তারা স্বল্প সময়ের জন্য স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু তা দ্রুত ভেঙে যায়। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পরও তারা কিছু সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত দমন-পীড়নের শিকার হয়।

বর্তমানে কুর্দিদের সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। যদি ইরানের সরকার টিকে যায়, তবে প্রতিশোধ হিসেবে কুর্দিরাই প্রথম লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। আর যদি সরকারের পতন ঘটে, তবে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে তুরস্কসহ অন্যান্য দেশও জড়িয়ে পড়তে পারে।

এই দ্বিধা কুর্দি সমাজের ভেতরেও প্রতিফলিত হচ্ছে। অনেকেই যুদ্ধকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন—এটি আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একজন প্রবীণ কুর্দি নেতা সতর্ক করে বলেন, ‘বোমা হামলায় স্বাধীনতা আসে না।’

তাঁর মতে, প্রকৃত পরিবর্তন আসতে পারে ইরানের ভেতর থেকেই—শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক বন্দিদের আন্দোলনের মাধ্যমে। কুর্দি বাহিনী তখন সরাসরি আক্রমণের বদলে শৃঙ্খলা রক্ষা করে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

সব মিলিয়ে, কুর্দিদের এই প্রস্তুতি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে। তারা ইতিহাসের এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে—যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সুযোগ ও বিপদের এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই এখন নির্ধারণ করবে, কুর্দিদের সংগ্রাম মুক্তির পথে এগোবে, নাকি আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত