Ajker Patrika

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলায় নিহত ৬, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা আঘাত তেহরানের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলায় নিহত ৬, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা আঘাত তেহরানের
ফাইল ছবি

ইরানে স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার রাতেও ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চলমান সংঘাতের এটি সবচেয়ে গুরুতর উত্তেজনা। এই সংঘাত এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও চাপ তৈরি করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ফরে এই হামলা চালাল। জুলাইয়ের পর সেটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলা। এর আগে গত সোমবার হরমুজ প্রণালি থেকে বেরিয়ে যাওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলা হয়। বিশ্বের তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি কার্যত জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে দিন শেষ করে।

জবাবে জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় তেহরান। একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে ইরান সতর্ক করে বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি ঠেকিয়ে দেবে তারা। এর আগে ট্রাম্প ইরানকে ‘কঠোরভাবে’ হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির কাছে উপকূলীয় এলাকা সিরিকের কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পাঁচজন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট। ইরানের মেহের সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। তবে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা এক প্রাদেশিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আহতের সংখ্যা ৬৮ জন বলে জানিয়েছে।

এসব প্রতিবেদনের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হরমুজ প্রণালির ওপর ‘তালা আরও শক্ত করে দেবে।’ যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রতি পাঁচ ব্যারেলের একটি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরানের সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘শত্রু যদি চায় আমরা পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি না করি, তাহলে কেউই তেল রপ্তানি করতে পারবে না।’

হামলার হুমকি কিংবা নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কোনোটিই তেহরানের অবস্থানে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। ইরান প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। মঙ্গলবারের মার্কিন হামলার আগে প্রায় এক মাস ধরে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মূলত সরাসরি হামলা থেকে বিরত ছিল, যদিও দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর ও হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার একটি ধাপ তারা সম্পন্ন করেছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ব্যবস্থা, সামুদ্রিক সামরিক সম্পদ ও স্থাপনা, মাইন পাতা ও বিস্ফোরক স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।

ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলা হয়েছে। এর মধ্যে আহভাজ শহরের কাছে একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের বেসামরিক জিরোফত বিমানবন্দরে হামলার খবর রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী চাবাহার, হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত বন্দরনগরী বান্দার আব্বাস এবং উপসাগরীয় উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসকেন্দ্র আসালুয়েহতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, প্রণালির উত্তর পাশে অবস্থিত ইরানের কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

পাল্টা হামলা ইরানের

মঙ্গলবারের হামলার জবাব না দিতে ইরানকে সতর্ক করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান পাল্টা হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র আরও ‘অনেক বেশি কঠোর ও উচ্চমাত্রায়’ হামলা চালাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘কিন্তু এটিই সবচেয়ে বড় হামলা হবে না। সবচেয়ে বড় হামলা অপেক্ষা করছে এবং সেটি শেষ হলে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকবে!’

এরপরও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং এতে ‘বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে।’ তবে জর্ডানে থাকা মার্কিন স্থাপনায় ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা। তারা বলেছেন, এটি প্রাথমিক তথ্য এবং ইরানের হামলা চলতে থাকায় পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।

ইরানের সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনী বাহরাইনে থাকা একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি শত্রু ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করেছে। এর মধ্যে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করা হয় এবং তিনটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। বাহরাইন জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড আরও জানিয়েছে, তাদের স্থলবাহিনী উত্তর ইরাকের এরবিলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হামলায় একটি মেরামতকেন্দ্র, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম রাখার কয়েকটি গুদাম এবং একটি মার্কিন নজরদারি বেলুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।

আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, হামলায় জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যায় এবং বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র, কেউই এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত