Ajker Patrika

নেপালে ছেলের খোঁজে ১৬০০ টাকা ধার করে দিনের পর দিন হাঁটছেন বাবা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নেপালে ছেলের খোঁজে ১৬০০ টাকা ধার করে দিনের পর দিন হাঁটছেন বাবা
নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তালকা সদা। ছবি: আল-জাজিরা

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ একমাত্র ছেলেকে খুঁজতে ২০০০ নেপালি রুপি (১৬০০ টাকার সমপরিমাণ) ধার করে দিনের পর দিন দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিচ্ছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব তালকা সদা। ক্ষুধা, ক্লান্তি, পায়ের ব্যথা আর হতাশা তাঁকে ঘিরে ধরলেও ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আশায় এখনো হাল ছাড়েননি তিনি।

তালকা সদা নেপালের তেরাই অঞ্চলের সপ্তরি জেলার বাসিন্দা। গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় উত্তর নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ধসে পড়ে ঘরবাড়ি, সেতু, স্কুল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। ওই বন্যার পর থেকেই নিখোঁজ সদার একমাত্র ছেলে ১৯ বছর বয়সী বিনোদ।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) আল-জাজিরা জানায়, বন্যার এক দিন আগে ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল সদার। এর প্রায় এক মাস আগে কাজের সন্ধানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলায় গিয়েছিলেন বিনোদ। সেখানে একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সিমেন্ট মেশানোসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের কাজ করতেন বিনোদ। সেখানে তাঁর সঙ্গে কাজ করা আরও চার তরুণ বন্যার পর থেকে নিখোঁজ।

চোখ মুছতে মুছতে সদা বলেন, ‘আমার স্ত্রী কীভাবে কাঁদছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। আমিও গভীর কষ্টে আছি। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

ছেলেকে খুঁজতে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছেন সদা। বিবর্ণ সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট আর বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে শরীরে জড়ানো কমলা রঙের পলিথিন—এই নিয়েই চলছে তাঁর দীর্ঘ যাত্রা। কাঁধে একটি ধূসর ব্যাগ। পকেটে থাকা নোংরা রুমালে গুঁজে রাখা ২ হাজার নেপালি রুপিরও কম অর্থই এখন তাঁদের সম্বল।

এই সামান্য অর্থও ধার করা। প্রতি ১০০ রুপি ধার নেওয়ার বিপরীতে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে সদাকে। সেই অর্থের কিছুটা খরচ হয়েছে সপ্তরি থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার বাসভাড়ায়। প্রায় ২৯২ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে সময় লাগে প্রায় ৯ ঘণ্টা।

কাঠমান্ডু পৌঁছে তাঁরা একের পর এক হাসপাতালে ছেলেকে খুঁজেছেন। বন্যাকবলিত উত্তরাঞ্চল থেকে উদ্ধার করা আহত ও মৃতদের অনেককেই রাজধানীতে নেওয়া হয়েছিল। মর্গের বাইরে থাকা মৃতদের ছবিগুলোও দেখেছেন তাঁরা। কিন্তু বিনোদের কোনো সন্ধান মেলেনি।

এরপর কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের নুয়াকোটের দিকে হাঁটা শুরু করেন দুই ভাই। ছেলের কর্মস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর আশায় ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে তারা ত্রিশুলি শহরে পৌঁছান। বন্যার ধ্বংসাবশেষ, কাদা ও পলিতে শহরের বাজারও প্রায় ঢেকে গেছে।

সদা জানান, আগের রাতে একটি লজে থাকার জন্য ১ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি দিতে হয়েছে। বিনিময়ে পেয়েছেন সামান্য ভাত, যা তাদের ক্ষুধাও মেটাতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘আর এক রাত থাকতে হলে আমার বাকি সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। তখন বাড়ি ফেরার মতোও কিছু থাকবে না।’

সদার অভিযোগ, মরদেহ রাখা মর্গ কিংবা উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে যেতে চাইলেও তাঁদের বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, তেরাই অঞ্চলের মাধেশি এবং প্রান্তিক মুসাহার সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ায় তাঁরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

সদা বলেন, ‘আমরা গরিব। তারা আমাদের মাধেশি ও বিহারি হিসেবে দেখে। আমরা নেপালি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারি না। তাই আমাদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠিয়ে দিচ্ছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, ‘ছেলের যদি মৃতও হয়, তবু তাকে দেখার অধিকার আমাদের আছে।’

তালকা সদার সঙ্গে আছেন তাঁর ভাইও। ছবি: আল-জাজিরা
তালকা সদার সঙ্গে আছেন তাঁর ভাইও। ছবি: আল-জাজিরা

নেপালি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগের ব্যাপকতার মধ্যেও উদ্ধার ও সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।

এদিকে কিছুক্ষণ পরপরই নিখোঁজ ছেলের ফোন নম্বরে কল করছেন সদা। কিন্তু এটি বারবার বন্ধই শোনাচ্ছে। কখনো অলৌকিক আশার কথা ভাবছেন তিনি—তরুণ ছেলে হয়তো কোথাও হেঁটে বা দৌড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। আবার পরক্ষণেই ভেঙে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘সে যদি বেঁচে থাকত, কোথাও থেকে হলেও ফোন করত।’

তবু থামছেন না সদা। ছেলের কর্মস্থল জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে আবারও যাত্রা শুরু করেছেন তিনি ও তাঁর ভাই। শেষ পর্যন্ত সাহায্য না পেলে ক্ষোভে পুলিশ স্টেশন পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত