Ajker Patrika

ট্রাম্প-ইরান চুক্তি: নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দুঃস্বপ্ন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১২: ১১
ট্রাম্প-ইরান চুক্তি: নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দুঃস্বপ্ন
ফাইল ছবি

ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা রোববার গভীর রাতে বাঙ্কারে জরুরি বৈঠকে বসে। আশঙ্কা ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার। সেই টানটান মুহূর্তে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। লাইনের ওপারে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরের খবর জানাতে ফোন করেছিলেন।

এটি ছিল ওই দিন দুই নেতার দ্বিতীয় ফোনালাপ। প্রথম ফোনালাপে ট্রাম্প ইসরায়েলি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জানান, বৈরুতের ওপর ইসরায়েলের আগের হামলা নিয়ে তিনি ‘pissed off’ বা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহুর ‘has no fucking judgment’—অর্থাৎ, তাঁর কোনো বিচারবোধ নেই। এসব তথ্য প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। দ্বিতীয় ফোনালাপে ট্রাম্প জানান, তারা যে যুদ্ধ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে একসঙ্গে শুরু করেছিলেন, সেটি কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

২০১৫ সালে যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন নেতানিয়াহু সেটিকে প্রকাশ্যে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি খোদ মার্কিন কংগ্রেসের ভাষণে চুক্তি ও প্রেসিডেন্ট—উভয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং রিপাবলিকানদের সমর্থনও পান। কিন্তু এবার, সেই একই ধরনের একটি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে প্রায় কিছুই বলেননি।

যে নতুন সমঝোতা গড়ে উঠছে, তার আশঙ্কা ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বহুদিন ধরেই ছিল। এই চুক্তি হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করবে এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দেবে। পাশাপাশি ইসরায়েলের ঘোষিত যুদ্ধ লক্ষ্যগুলোর বিষয়ে আলোচনা পিছিয়ে যেতে পারে। এই সমঝোতা স্মারক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো জটিল বিষয়গুলোকে পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দিচ্ছে। অথচ এর মধ্যেই তেহরানের অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা শিথিল হচ্ছে।

ট্রাম্প সমঝোতা ঘোষণা করার পর নেতানিয়াহু যখন শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্য বক্তব্য দেন, তার অনেক আগেই ইসরায়েলি রাজনীতিকেরা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেলেছিলেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যার সংবাদ সম্মেলনে তাঁর আট মিনিটের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি পুরো চুক্তি নিয়েই প্রায় কোনো কথাই উল্লেখ করেননি। আরও বিস্ময়ের বিষয়, তিনি ট্রাম্পের কথাও প্রায় উল্লেখ করেননি। বছরের পর বছর যেভাবে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন, সেই স্বরও এবার অনুপস্থিত ছিল। পরে চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমি একই দৃষ্টিভঙ্গিতে নই...আমি ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের দায়িত্বে আছি এবং তা বিচক্ষণতার সঙ্গে করতে হবে।”

এই সমঝোতা ইরানের দাবির কারণে ইসরায়েলের ওপর নতুন কিছু সীমাবদ্ধতাও আনতে পারে, বিশেষ করে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। ইরান দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার দাবি করছে—যা ইসরায়েল মানতে রাজি নয়। সোমবার এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, এই প্রত্যাহার ‘চুক্তির শর্ত নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরান যদি হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এবং তারা যদি ইসরায়েলি অবস্থান বা শহরগুলোতে হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার এবং পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার থাকবে।’

এ পর্যন্ত নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি প্রকাশ্য বিরোধ এড়িয়ে চললেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক বেশি তীব্র। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মতরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই চুক্তিকে ‘বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, ইসরায়েল নিজেদের এই চুক্তির দ্বারা বাধ্য মনে করে না।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত এটিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য ‘বিপজ্জনক মোড়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট—যিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আছেন—এটিকে ‘দুর্বল কৌশল ও সাহসের অভাবে জন্ম নেওয়া দুঃখজনক ফলাফল’ বলে বর্ণনা করেন।

নেতানিয়াহুর এই নীরবতা একদিকে যেমন সংবেদনশীল কূটনৈতিক মুহূর্তের প্রতিফলন, অন্যদিকে ট্রাম্পকে ঘিরে তাঁর নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রীয় অবস্থানকেও প্রকাশ করে। সূত্র অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে তাঁর রাজনৈতিক দল একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা ভেবেছিল—ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়, সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসে বিজয়ী সফর, নির্বাচনী শেষ পর্যায়ে ট্রাম্পের ইসরায়েল সফর এবং সেই প্রেসিডেন্টীয় ছবির ঢেউয়ে অক্টোবরের নির্বাচনে জয়।

কিন্তু এখন যুদ্ধ শেষ করার আলোচনা দুই নেতার সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করছে। প্রকাশ্য বিরোধে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধ থামানোর এবং লেবাননে সীমিত অভিযান চালানোর চাপ দিচ্ছেন। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির আহ্বান, ইরান পারমাণবিক আলোচনার ঘোষণা এবং এবিসি নিউজে নেতানিয়াহু এখনও রাজনীতিতে ‘চালিয়ে যেতে চান কি না’—এই প্রশ্ন তোলা, সবই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জন্য অপ্রত্যাশিত।

রাজনৈতিক পরামর্শক নাদাভ স্ট্রাউখলার—যিনি আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কাজ করেছেন—এই মুহূর্তকে নেতানিয়াহুর জন্য ‘একটি পরীক্ষার মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি মনে করেন, ট্রাম্প–নেতানিয়াহু সম্পর্ক এখনো ভাঙার পর্যায়ে যায়নি।

তিনি বলেন, ‘আমি সম্পর্ককে এত দ্রুত শেষ বলে মনে করি না।’ তাঁর মতে, অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে সম্পর্ক আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং ট্রাম্পই প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু থাকবেন। তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প আগেও ক্ষুব্ধ হয়েছেন—নেতানিয়াহুর ওপর, অন্য নেতাদের ওপর—তবু সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়েছে। শেষ দুই সপ্তাহ পর্যন্ত দুইজনের মধ্যে প্রায় কোনো দূরত্বই ছিল না। এখনো ট্রাম্প তাঁকে সম্মান করেন এবং দরজা বন্ধ করেননি। এখনো ৬০ দিন আছে চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তিকে প্রভাবিত করার জন্য। যতক্ষণ একটি শিখা জ্বলছে, জানালা খোলা আছে, নেতানিয়াহু চিমনি দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করবেন।’

ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-তে পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে—যে চ্যানেল একসময় ট্রাম্পকে ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে বর্ণনা করত, তারাই এখন তাঁকে ‘পরাজিত’ ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের অবস্থান দুর্বলকারী হিসেবে সমালোচনা করছে। নেতানিয়াহুর দর লিকুদ পার্টির এক সূত্র তাঁকে পরাজয়ের পর জাপানের সম্রাটের সঙ্গে তুলনা করেছে। ওই সূত্র বলেন, ‘এ মুহূর্তে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ঘাঁটিতে খুবই অজনপ্রিয়।’ তবে তিনি আরও জানান, নির্বাচনের আগে এই অবস্থান বদলাতেও পারে।

পরিসংখ্যানও একই চিত্র দিচ্ছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ট্রাম্পের বিবেচনার কেন্দ্র হিসেবে দেখেন—এমন ইহুদি ইসরায়েলির হার মার্চের ৬৪ শতাংশ থেকে কমে এই মাসে ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৪ সালের শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন।

ডানপন্থী বিশ্লেষক মাটি টুচফেল্ড দৈনিক মা’আরিভ পত্রিকায় লেখেন, ‘ট্রাম্পের অবস্থান তলানির দিকে যাচ্ছে। তবে এটি পতন নয়, কিন্তু প্রবণতা নিম্নমুখী।’ তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর প্রচার দল এখন নতুন বার্তা খুঁজছে, কারণ ‘স্ট্রং টুগেদার’ ধরনের প্রচার আর আগের মতো কার্যকর হবে না।

বিরোধী শিবিরও এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে জানায়, যদি ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সমর্থন করেন, তবে তারা সেটিকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে এবং বলবে তিনি ‘পুডলের মতো আচরণ করেছেন এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন।’ বিরোধীরা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের কাছে বার্তাও পাঠাচ্ছে, যাতে তিনি নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় না হন।

তবুও নেতানিয়াহুর শিবির মনে করছে এটি সাময়িক বাধা। এক ইসরায়েলি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, নেতানিয়াহু নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের চেষ্টা করছেন—যা তাঁর কার্যালয় অস্বীকার করেছে। এমন বৈঠক তাঁকে ইরান চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ জানাতে সুযোগ দেবে, এবং রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার ছবি ব্যবহার করার সুযোগও তৈরি করবে—যে ছবিই তাঁর নির্বাচনী পুঁজি হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত