Ajker Patrika

নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা দূর করতে পারে মাথায় বৈদ্যুতিক শক: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
নারীকে পণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা দূর করতে পারে মাথায় বৈদ্যুতিক শক: গবেষণা
নারীকে বস্তু বা পণ্য হিসেবে দেখা মানসিকতা দূর করার চিকিৎসা আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: সংগৃহীত

মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীকে ‘মানুষ’ না ভেবে ‘বস্তু’ বা ‘পণ্য’ হিসেবে দেখার যে মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা রয়েছে, তা মস্তিষ্কে হালকা তড়িৎ উদ্দীপনা (ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেশন) দিয়ে সাময়িকভাবে বদলে দেওয়া সম্ভব বলে এক নতুন গবেষণায় দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী।

ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, মাথার খুলির ওপরের অংশে ১০ মিনিট ধরে অতি মৃদু মাত্রার বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রয়োগ করার ফলে নারীদের যৌন আবেদনময় বা খোলামেলা ছবিকে ‘বস্তু’ হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করার প্রত্যক্ষ প্রবণতায় পরিবর্তন ঘটেছে।

বিজ্ঞান সাময়িকী সোশ্যাল নিউরোসায়েন্স-এ প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনটি বিজ্ঞানীদের সামনে মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাত বোঝার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

সাধারণত মানব মস্তিষ্ক কোনো মানুষের মুখাবয়ব বা পূর্ণাঙ্গ শরীর সোজা অবস্থায় সামনাসামনি থাকলে তা খুব দ্রুত চিনতে পারে। কিন্তু ছবিটি উল্টো করে দিলে তা চিনতে মস্তিষ্কের বেশি সময় লাগে। যন্ত্র বা আসবাবপত্রের মতো নির্জীব বস্তু বা পণ্যের ক্ষেত্রে সোজা বা উল্টো ছবির মধ্যে এই পার্থক্যের প্রভাব মস্তিষ্কে তেমন একটা পড়ে না।

পূর্ববর্তী একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ বা নারী—উভয় দর্শকের ক্ষেত্রেই খোলামেলা বা অবমাননাকর ভঙ্গিতে থাকা নারীদের ছবির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের এই ‘সোজা বনাম উল্টো’ শনাক্তকরণ ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই তখন সেই নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের বদলে একটি ‘বস্তু’ বা ‘অবজেক্ট’ হিসেবে ধরে নেয়। তবে পুরুষদের ছবির ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাথার স্ক্যাল্পে (খুলি) নির্দিষ্ট তড়িৎ সিগন্যাল দেওয়ার পর অংশগ্রহণকারীদের সোজা অবস্থায় থাকা নারীদের ছবি চেনার ক্ষমতা উন্নত হয়েছে এবং পুরুষ ও নারীর ছবি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের যে বৈষম্যমূলক পার্থক্য ছিল, তা দূর হয়েছে।

গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক চিরো সিভিলে বলেন, ‘যৌন অবজেক্টিফিকেশন বা পণ্যকরণ মানে হলো কোনো মানুষকে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে না দেখে কেবল দেখার বা ব্যবহারের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা। এটি একটি অমানবিক আচরণ, যা সবচেয়ে বেশি শিকার হন নারীরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল প্রমাণ করে, দৃশ্যমান বিষয়বস্তু প্রক্রিয়াজাতকরণে আমাদের দৃষ্টি ব্যবস্থার এই পক্ষপাত মস্তিষ্কে মৃদু উদ্দীপনার মাধ্যমে—অন্তত সাময়িকভাবে হলেও—পরিবর্তন করা সম্ভব।’

তবে এটি কোনো সামাজিক সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি পরিষ্কার করেন, ‘এটি একটি ল্যাবভিত্তিক পরীক্ষা। আমরা এখানে অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব মনোভাব বা সামাজিক আচরণ পরিমাপ করিনি, আর ব্রেইন স্টিমুলেশন যৌনতার বা লিঙ্গবৈষম্যের কোনো ওষুধ নয়। তবে এটি মস্তিষ্কে পণ্যায়ন বা অবজেক্টিফিকেশন কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার একটি নতুন উপায় তৈরি করেছে।’

কীভাবে পরিচালিত হলো গবেষণা?

এই পরীক্ষায় ৫৪ জন ছাত্রী এবং ২২ জন ছাত্র অংশ নেন। তাঁদের অন্তর্বাস পরিহিত নারী ও পুরুষ মডেলদের সোজা এবং উল্টো করা বেশ কিছু ছবি ভালো করকে দেখতে বলা হয়। পরবর্তীতে নতুন কিছু ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তাঁদের আগের ছবিগুলো শনাক্ত করতে দেওয়া হয়।

অংশগ্রহণকারীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল:

প্রথম দল: এই দলের অংশগ্রহণকারীদের মাথায় ১০ মিনিট ধরে মৃদু তড়িৎ তরঙ্গ প্রয়োগ করা হয়।

দ্বিতীয় দল (প্লাসিবো বা ভুয়া চিকিৎসা): এই দলকে কেবল ৩০ সেকেন্ডের জন্য সামান্য সিগন্যাল দেওয়া হয়, যাতে তারা তড়িৎ উদ্দীপনার অভিজ্ঞতা অনুভব করেন কিন্তু কোনো বড় পরিবর্তন না ঘটে।

পরীক্ষায় দেখা যায়, প্লাসিবো পাওয়া দলটি পুরুষদের সোজা ছবিগুলো খুব সহজে চিনতে পারলেও নারীদের ছবির ক্ষেত্রে সেই সুবিধা পায়নি—যা বস্তুর ছবি চেনার আচরণের অনুরূপ। অন্যদিকে, ১০ মিনিটের প্রকৃত তড়িৎ চিকিৎসা পাওয়া দলটি নারীদের সোজা ছবি খুব দ্রুত চিনতে সক্ষম হয় এবং পুরুষ ও নারীর ছবি চেনার মধ্যে থাকা মস্তিষ্কের পার্থক্যটি দূর হয়ে যায়।

গবেষকেরা জানান, যৌন হয়রানির প্রতি সহনশীলতা, শরীরের রূপ নিয়ে হীনমন্যতা (বডি শেম), খাওয়াদাওয়ার মানসিক ব্যাধি (ইটিং ডিসঅর্ডার) এবং অবসাদের মতো বিষয়ের সঙ্গে এই ‘যৌন পণ্যকরণ’ দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে জড়িত।

অধ্যাপক সিভিলে জানান, এর আগের গবেষণাগুলোতে ছবির ধরন বদলে বা পর্যবেক্ষকের মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা করে এই মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাত কমানোর চেষ্টা করা হতো। কিন্তু এবারই প্রথম সরাসরি পর্যবেক্ষকের মস্তিষ্কে উদ্দীপনা দিয়ে দৃষ্টির এই অবচেতন রূপান্তরকে পরীক্ষা করা হয়েছে।

উভয় দলকেই একই ছবি দেখানো হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যাটি ছবির মধ্যে নয়, বরং আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে ছবিটি দেখছে ও বিশ্লেষণ করছে তার ওপর নির্ভর করে। এটি ভিজ্যুয়াল প্রসেসিং বা দৃষ্টিলব্ধ জ্ঞানে কীভাবে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত তৈরি হয়, তা গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত