Ajker Patrika

ত্বকের ক্যানসার ঠেকাতে এল প্রথম এমআরএনএ ভ্যাকসিন, সাফল্যের হার ৪২ শতাংশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৬: ২১
ত্বকের ক্যানসার ঠেকাতে এল প্রথম এমআরএনএ ভ্যাকসিন, সাফল্যের হার ৪২ শতাংশ
প্রতীকী ছবি। ছবি: ম্যাগনিফিক

অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা ক্যান্সারের প্রতিষেধক হিসেবে বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন তৈরি করার পর ২০ বছর পার হয়ে গেছে। এইচপিভি (HPV) ভ্যাকসিনের কারণে অস্ট্রেলিয়া এখন বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি হিসেবে জরায়ুমুখের ক্যান্সার নির্মূল করার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। এবার, অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত নতুন এক গবেষণা ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে তা ত্বকের ক্যান্সারের জন্য।

ক্যান্সারের প্রথম পার্সোনালাইজড এমআরএনএ (mRNA) ভ্যাকসিন এখন ফেজ–৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সফল হয়েছে। এটি শুধু সাধারণ ইমিউনোথেরাপি ব্যবহারের তুলনায় মেলানোমা (এক ধরনের ত্বকের ক্যান্সার) পুনরায় ফিরে আসা বা এর ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

বিজ্ঞানীরা যতটুকু আশা করেছিলেন, ফল এসেছে তার চেয়েও অনেক ভালো। মেলানোমা ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়ার (এমআইএ) মেডিকেল অনকোলজিস্ট ও গ্লোবাল প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর জর্জিনা লং ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিকেল অনকোলজি কংগ্রেস ২০২৬-এ এই ফলাফলের তথ্য তুলে ধরেন। এই তথ্যগুলো নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

লং বলেন, ‘এই ফলাফলগুলো ক্যান্সার নিরাময়ের প্রক্রিয়ায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে: ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি বা মৃত্যু কমাতে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও ব্যক্তিগত উপায়ে কাজে লাগানো হয়েছে। ক্যান্সার ওষুধের ইতিহাসে এটি আগে কখনো সম্ভব হয়নি।’

আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যান্সার রিসার্চের হবু সভাপতি ও মেডিকেল অনকোলজিস্ট রবার্ট ভন্ডারহেইড (যিনি এই ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, এই ট্রায়ালের ফলাফলগুলো আমাদের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর সারিতে জায়গা করে নেবে। এই এমআরএনএ ভ্যাকসিনটি মডার্না ও মার্ক তৈরি করেছে। অস্ত্রোপচারের পর মেলানোমা যাতে আবার ফিরে আসতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রথমেই, গবেষকরা প্রতিটি রোগীর টিউমারের জিনগত অনুক্রম বিশ্লেষণ করেন। তারপর তারা বের করেন যে রোগীর শরীরের সুস্থ কোষগুলো থেকে এই টিউমারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বা ‘ছাপ’ কোথায় আলাদা। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ভ্যাকসিনটি রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে ক্যান্সারের একটি পার্সোনালাইজড ‘ওয়ান্টেড পোস্টার’ তৈরি করে দেয়।

লং বলেন, ‘এটি এমআরএনএ হিসেবে শরীরে প্রয়োগ করা হয়। তাই রোগীর শরীরের কোষগুলোই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সামনে সেই পোস্টারটি তুলে ধরে এবং ঠিক কোথায় আক্রমণ করতে হবে আর কাকে খুঁজে বের করতে হবে তা দেখিয়ে দেয়।’ এই ওষুধটি ‘কিট্রুডা’ (পেমব্রোলিজুমাব) নামের একটি বিদ্যমান ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে মিলে কাজ করে। লং বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন, ‘ক্যান্সার কোষ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এক ধরনের ‘ভুয়া বন্ধুত্বপূর্ণ হাত মেলানো’র মাধ্যমে ধোঁকা দেয়, যাতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মনে করে ক্যান্সার কোষটি একটি সাধারণ কোষ। পেমব্রোলিজুমাব সেই হাত মেলানোর পথটি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ইমিউন কোষগুলো ক্যান্সারকে চিনতে পারে এবং সেটিকে আক্রমণ করতে পারে। তবে এটি সবার জন্যই একই ওষুধ।’

পেমব্রোলিজুমাবের সঙ্গে রোগীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি চিকিৎসা যুক্ত করায় ফলাফল আরও অনেক ভালো পাওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে ১৫৭টি কেন্দ্রে ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি রোগীর ওপর এই ফেজ ৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি চালানো হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ফেজ ২ ট্রায়ালের চমকপ্রদ ফলাফলের সত্যতা এই ট্রায়ালটিতেও প্রমাণিত হয়েছে।

যেসব রোগী চিকিৎসা শুরু করার ছয় মাস পর পর্যন্ত ক্যান্সারমুক্ত ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে শুধু পেমব্রোলিজুমাব ব্যবহারের তুলনায় ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ কমেছে। এই এমআরএনএ ভ্যাকসিনটি এখনো অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের রোগীদের জন্য বাজারে আনা হয়নি, তবে ফলাফলগুলো এখন সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। দেশভেদে এই অনুমোদন পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।

তবে কেবল ত্বকের ক্যান্সারই নয়, এমআরএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্য আরও ক্যান্সার নিরাময়ের আশা তৈরি হয়েছে। লং বলেন, ‘মেলানোমার ক্ষেত্রে সফলতা পাওয়ায়, এই কার্যকারিতার প্রমাণটি ক্যান্সারের চিকিৎসায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। এটি রোগীদের দীর্ঘ সময় ধরে ক্যান্সারমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে।’

এমআইএ-এর আরেকজন মেডিকেল অনকোলজিস্ট অ্যালেক্স মেনজিসও এতে একমত প্রকাশ করেছেন। মেনজিস বুঝিয়ে বলেন, ‘নিকট ভবিষ্যতের আশা হলো যে এটি কেবল মেলানোমার জটিল রোগীদের অবস্থাই ভালো করবে না, বরং অন্যান্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও কাজে আসবে যেখানে বর্তমান ইমিউনোথেরাপিগুলো তেমন কার্যকরী নয়।’

এটি বেশ আশাব্যঞ্জক এক ধারণা, তবে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। সম্প্রতি, কোলন ক্যান্সার এবং মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারের জন্য এমআরএনএ ভ্যাকসিনের কয়েকটি ট্রায়াল চালিয়ে দেখা গেছে যে সেগুলো ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই কারণেই নতুন এই ফলাফলটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লং বলেন, ‘ইন্টারপাথ-০০১ (INTerpath-001) ট্রায়াল প্রমাণ করেছে যে রোগীর নিজস্ব টিউমারের অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়ে তৈরি চিকিৎসা যদি চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে, তবে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে যেন তা বাকি থাকা ক্যান্সার কোষগুলোকে খুঁজে ধ্বংস করতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত