Ajker Patrika

মানব পাচার মামলায় শাস্তি ৫ শতাংশের

  • ৩ হাজার আসামির মধ্যে মাত্র ১৮১ জনের শাস্তি।
  • প্রতি মাসে গড়ে ৬৪টি মানব পাচার মামলা।
  • ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও অভিযোগপত্র অন্যতম কারণ: আইনজীবী
  • বাদী ও বিবাদীর মীমাংসা করাও শাস্তি কমের কারণ: পিপি
আমানুর রহমান রনি ও রাসেল মাহমুদ, ঢাকা
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭: ৫৮
মানব পাচার মামলায় শাস্তি ৫ শতাংশের
ফাইল ছবি

রিক্রুটিং এজেন্সি জান্নাত ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ সোনা মিয়াকে কিরগিজস্তানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২০২৪ সালে ৫ লাখ টাকা নিয়েছিল। সোনা মিয়াকে ৬০-৬৫ হাজার টাকা বেতনে কার ওয়াশের (গাড়ি ধোয়া) কাজ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বিমানবন্দরে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সব কাগজপত্রই জাল। সোনা মিয়া টাকা ফেরত বা বিচার—কোনোটাই পাননি এ পর্যন্ত। এ ধরনের অপরাধ অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের তথ্যই বলছে, গত কয়েক বছরের হিসাবমতে, প্রতি মাসে গড়ে ৬৪টি মানব পাচার মামলা হয়েছে। মামলার বাইরেও ঘটে থাকতে পারে প্রতারণার কিছু ঘটনা।

সোনা মিয়া নিজের অটোরিকশা ও ভাইয়ের গরু বিক্রি করে এবং ঋণ নিয়ে জান্নাত ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইব্রাহিম মল্লিক নাহিদকে ২০২৪ সালের মার্চে ৫ লাখ ১২ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ৭ এপ্রিল ইব্রাহিম মল্লিক তাঁকে কিরগিজস্তানে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট, বিমান টিকিটসহ বিভিন্ন কাগজপত্র দিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠান। কিন্তু সব কাগজপত্র জাল থাকায় সোনা মিয়াকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি।

বিচলিত সোনা মিয়া জান্নাত ট্রেডের মালিক ইব্রাহিমকে ফোন করলে তাঁর নম্বর বন্ধ পান। পরে বিমানবন্দর থেকে নয়াপল্টনে তাঁর অফিসে যান। কিন্তু অফিসও বন্ধ পান। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সোনা মিয়া দেশের বাড়িতে ফিরে যান। ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি পল্টন থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামি করেন

জান্নাত ট্রেডের মালিক ইব্রাহিম মল্লিক, তাঁর স্ত্রী ও ম্যানেজার শারমিন হোসেন লাবণী ও অফিস সহকারী আরিফুর রহমান সাদিকে। মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে। মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ১৮ দিনের মাথায়ই তাঁরা জামিনে বের হয়ে যান। এখনো আসামিরা বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর কাজ করছেন।

জান্নাত ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইব্রাহিম মল্লিক নাহিদের দুটি ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

সিআইডি প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে গত বছরের ২২ এপ্রিল তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। কিন্তু বিচারকাজ শেষ হচ্ছে না। তারিখের পর তারিখ পড়ছে আদালতে। হতদরিদ্র সোনা মিয়া এখন এনজিওর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের চাপে এলাকাছাড়া। অর্থাভাবে মামলার খবরও নিতে পারেন না।

গত শুক্রবার সোনা মিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, মামলা করলে টাকা ফেরত পাব। কিন্তু এখন আসামিরা বলছে, মামলায় যা হবে তখন দেখা যাবে। তারা টাকা দিচ্ছে না। সবাই জামিনে বের হয়ে গেছে। মামলার কী হয়েছে তা-ও আমি জানি না।’

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জান্নাত ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ফরিদপুরের আকতার সরদার, আকলিমা আক্তার, মো. আকাশ শেখ ও হারুন বিশ্বাস নামে আরও কয়েকজনের কাছ থেকে ১৪ লাখ ২২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাঁদের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সোনা মিয়ার ভোগান্তি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জনশক্তি রপ্তানি খাতে অসাধু আদম ব্যবসায়ীদের এ রকম প্রতারণা আর হয়রানি কার্যত নৈমত্তিক বিষয়। অপরাধীদের যথাযথ সাজা না হওয়া এ ধরনের অন্যায় না কমার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে ৪ হাজার ৭৭৩টি মামলা করা হয়েছে। এতে আসামি ছিল ৪০ হাজার ৮৪৭ জন। এই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে মামলা হয়েছে ৬৪টি। থানার পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি এসব মামলা তদন্ত করে। এসব মামলার মধ্যে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৭৩টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ ৬৩৩টি মামলার আসামিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এ ছাড়া ২ হাজার ৮৪০টি মামলায় ৩ হাজার ৭০৯ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এই ৩ হাজার ৭০৯ আসামির মধ্যে বিচারিক আদালতে মাত্র ১৮১ জনের শাস্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ জনের যাবজ্জীবন সাজা এবং ১৫৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগপত্রে নাম থাকা আসামিদের মাত্র ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশের সাজা হয়েছে। বাকি সব আসামিই খালাস পেয়ে গেছেন।

এত বেশি আসামির মামলা থেকে অব্যাহতির কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ফৌজদারি অপরাধবিষয়ক মামলার বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, ‘মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত, ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগপত্র, ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত আইনজীবী না থাকা, বাদীর মামলার খোঁজ না রাখা এবং বাদী ও বিবাদীর সমঝোতা। তাই অনেক মামলাতেই অভিযুক্তরা শাস্তি পান না। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘মানব পাচার মামলার অধিকাংশই আপস-মীমাংসা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই টাকা ফিরে পাওয়ার জন্যই মামলা করেন। এতে আদালতে আসার পরও মীমাংসা হয়। তবে প্রকৃত মানব পাচারকারীদের ক্ষেত্রে সাজা হয়ে থাকে।’

আসামিদের খালাস পাওয়ার বিষয়ে ফারুকী বলেন, ‘কোনো ঘটনায় মামলা যখন হয় তখন কেউ না কেউ থাকে। অভিযোগপত্রে সবার বিষয়টি থাকলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই বিচারকার্য হয়ে থাকে।’

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, মানব পাচার বন্ধে সরকারের সচেতনতা বৃদ্ধির আরও কর্মসূচি নেওয়া উচিত। পাশাপাশি মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সাগরপথে ডুবে মৃত্যুর মতো কোনো ঘটনার পর সরকার ও পুলিশ তৎপর হয়, কিন্তু সারা বছর এটা নজরদারিতে রাখতে হবে। তাহলে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

অবশেষে অনশনরত স্বামীর হাত ধরে ঘরে ফিরলেন সেই স্ত্রী

ভূপাতিত বিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধারের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবে ইরান থেকে বের হতে পারেনি

ইরানে হামলায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ২০০০টি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে আনছে যুক্তরাষ্ট্র, একটার দাম ১৫ লাখ ডলার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত