Ajker Patrika

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত খাওয়াদাওয়া ও ঘুমানো সত্ত্বেও কেন অপুষ্টিতে ভোগেন

পুষ্টিবিদ লিনা আকতার
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত খাওয়াদাওয়া ও ঘুমানো সত্ত্বেও কেন অপুষ্টিতে ভোগেন

অনেকে মনে করেন, প্রতিদিন পরিমাণমতো খাবার খেলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা নেই। কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত খাবার ও ঘুমের পরও কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অপুষ্টিতে ভুগতে পারেন। কারণ, শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, খাবারের গুণমান, শরীরে পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা এবং বিভিন্ন রোগ পুষ্টির অবস্থাকে প্রভাবিত করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অপুষ্টি বলতে শুধু কম খাওয়াকে বোঝায় না। শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত পুষ্টি গ্রহণ বা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যহীনতাও অপুষ্টির অন্তর্ভুক্ত। ২০২২ সালে বিশ্বে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৩৯ কোটি মানুষের ওজন ছিল কম।

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের অপুষ্টি অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয়। শুরুতে বিষয়টি সহজে বোঝা যায় না। পরে অকারণে ওজন কমে যাওয়া, পেশির শক্তি কমে যাওয়া, সব সময় ক্লান্ত লাগা বা দৈনন্দিন কাজ করতে দুর্বলতা অনুভূত হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

পর্যাপ্ত খাবার খেলেও কেন অপুষ্টি হয়

এর অন্যতম কারণ হতে পারে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা। খাবার খাওয়ার পর সেটি হজম হয়ে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষিত হওয়ার কথা। কিন্তু অন্ত্রের সমস্যা বা অন্য কোনো রোগের কারণে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে পর্যাপ্ত খাবার খেলেও শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না।

অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা, দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, কিছু হজমজনিত রোগ এবং যকৃৎ বা অগ্ন্যাশয়ের সমস্যার সঙ্গে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও প্রাপ্তবয়স্কদের অপুষ্টির সঙ্গে অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যকৃতের রোগ এবং অ্যালকোহল বা মাদক ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোর সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।

বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ক্ষুধা কমে যাওয়া, খাবারের স্বাদ পরিবর্তন, দাঁতের সমস্যা, গিলতে অসুবিধা, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে খাবার গ্রহণ কমে যেতে পারে। এসব কারণে বয়স্কদের পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়ে পেশি ও হাড়ের ভর এবং শারীরিক সক্ষমতা কমতে পারে।

বেশি খাওয়া সমাধান নয়

অপুষ্টিতে ভুগলে হঠাৎ অনেক বেশি খাবার খাওয়া সব সময় সমাধান নয়। কী কারণে ওজন কমছে বা শরীরে পুষ্টির ঘাটতি হচ্ছে, সেটি আগে বোঝা জরুরি।

খাদ্যতালিকায় ভাত, রুটি বা আলুর মতো শর্করাজাতীয় খাবারের পাশাপাশি মাছ, ডিম, মাংস, ডাল, দুধ, দই, বাদাম ও বীজজাতীয় পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে। খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় চর্বি থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ততা, ভারসাম্য, পরিমিতি ও বৈচিত্র্যকে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অর্থাৎ শুধু বেশি ক্যালরি নয়, বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খাওয়া জরুরি।

যাঁদের একসঙ্গে বেশি খাবার খেতে সমস্যা হয়, তাঁরা দিনে তিনবার খাবারের পাশাপাশি অল্প পরিমাণে পুষ্টিকর নাশতা খেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দুধ, দই, ডিম, ফল, বাদাম বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণে বারবার উচ্চ শক্তি ও উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শরীরচর্চা ও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ

পুষ্টির ঘাটতি পূরণে শুধু খাবারের দিকে নজর দিলে হবে না। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী পরিমিত শারীরিক কার্যকলাপ পেশির শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। এ জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধা না লাগা, পেশির শক্তি কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, বারবার ডায়রিয়া বা হজমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন, বিএমআই, খাদ্যাভ্যাস ও পেশির পরিমাণ মূল্যায়ন করতে পারেন। প্রয়োজন হলে রক্ত বা অন্যান্য পরীক্ষা করে পুষ্টির ঘাটতির কারণ খুঁজে দেখা হয়। এরপর ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা ও চিকিৎসার পরিকল্পনা করা যায়।

দীর্ঘদিন শরীরে অপুষ্টি থাকলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে পারে এবং অসুস্থতা থেকে সুস্থ হতে বেশি সময় লাগতে পারে। রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত অপুষ্টি শারীরিক সুস্থতা ও রোগ থেকে সেরে ওঠার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

লিনা আকতার, (পুষ্টিবিদ)

রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত