Ajker Patrika

বয়সজনিত স্বাস্থ্যসেবা: জীবনসায়াহ্নে স্নেহের চাদর

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
বয়সজনিত স্বাস্থ্যসেবা: জীবনসায়াহ্নে স্নেহের চাদর
পূর্বাচলে শীতলক্ষ্যাতীরে গড়ে উঠেছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটাল। ছবি: লেখক

ষাট পেরোনোর পর মানুষের জীবনে চিকিৎসার প্রয়োজন যেমন বাড়ে, তেমনি বদলে যায় প্রতিদিনের অনেক চাহিদা। একসময় যে কাজ নিজেই করা গেছে, বয়সের ভারে তা হয়ে ওঠে অন্যের সহায়তানির্ভর। তখন ওষুধের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় নিয়মিত দেখভাল, নিরাপদ পরিবেশ, মানসিক প্রশান্তি এবং মানুষের সঙ্গ। অথচ দেশে এসব এক ছাদের নিচে পাওয়ার সুযোগ এখনো খুব বেশি নয়। প্রবীণদের বয়সজনিত স্বাস্থ্যসেবার এই বিশেষায়িত ক্ষেত্রই জেরিয়াট্রিক সেবা।

এই ঘাটতি পূরণের একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস অ্যান্ড হসপিটাল (জেবিএফআরএইচ)। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা রোডে, পূর্বাচলের কাছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ১০ বিঘা জায়গায় গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর। প্রথম দেখায় জায়গাটিকে প্রচলিত হাসপাতাল মনে হয় না। আবার এটি সাধারণ আবাসনও নয়। বসবাসের পাশাপাশি চিকিৎসা, পরিচর্যা ও অবসর কাটানোর নানা ব্যবস্থা মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে আলাদা একটি পরিসর। কোথাও চিকিৎসাসেবা চলছে, কোথাও ব্যায়াম করছেন কেউ; আবার কেউ কেয়ারগিভারের সহায়তায় হাঁটছেন, কেউ বসে আড্ডা দিচ্ছেন।

প্রবীণদের আরাম ও চলাচলের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে এ হোমসের স্থাপনার নকশায়। পাঁচতলা চারটি ভবনের নাম পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুরমা। মোট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ২৩২টি। লিফট ও প্রশস্ত করিডরের পাশাপাশি হুইলচেয়ারে চলাচলের ব্যবস্থাও রয়েছে। এখানে বসবাসকারী কেউ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলেও চারদেয়ালের মধ্যে আটকে থাকতে হয় না। শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালের বিছানাতেই তাঁকে ভবনের ছাদে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ছাদের খোলা পরিবেশে ফুল, লতাগাছ ও সবুজের সমারোহে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ আছে এখানে।

জেবিএফআরএইচের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা যুক্ত করা হয়েছে। কক্ষেই চিকিৎসক, নার্স ও প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভারের সহায়তা পাওয়া যায়। পুষ্টিবিদের পরামর্শে প্রস্তুত পাঁচ বেলার খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় কক্ষে। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা। দিন কাটানোর জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন। শরীরচর্চায় জিম, সুইমিংপুল, জ্যাকুজি, স্টিমবাথ ও ফিজিওথেরাপি সেন্টার রয়েছে। অবসর কাটাতে আছে লাইব্রেরি ও মুভি থিয়েটার। ইয়োগা, হাঁটা, আড্ডা ও নদীভ্রমণের সুযোগও রাখা হয়েছে। যাঁদের চলাফেরা খুব সীমিত, তাঁদের জন্য রয়েছে ১৫০ শয্যার কেয়ার সেন্টার। আর জটিল অসুস্থতা নিয়ে জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীদের জন্য ৮০ শয্যার প্যালিয়েটিভ ও হসপিস কেয়ার ইউনিট।

অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান
অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান

এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় জাপানের প্রবীণ পরিচর্যার কাঠামো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তাঁর। দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জেবিএফআরএইচ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন তিনি। জাপানি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় পরে সেই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পায়।

অধ্যাপক নাঈমের চিকিৎসাজীবনও দীর্ঘ। ১৯৯১ সালে দেশে ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেক্টমি সার্জারি চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। রাজধানীতে প্রতিষ্ঠা করেন জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। বর্তমানে জেবিএফআরএইচের প্রফেসর অব সার্জারি ও চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন তিনি।

প্রবীণদের জন্য এই ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও রয়েছে। নিজের মা ও শ্বশুরকে তিনি এখানে রেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষ যখন অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসিক স্বস্তিরও প্রয়োজন হয়।’

তবে এই সেবা এখনো মূলত সচ্ছল প্রবীণদের জন্য। অধ্যাপক নাঈমের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এমন সেবাকেন্দ্র তৈরি হবে। তাঁর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশা ইসলাম নাঈমও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত।

জেবিএফআরএইচের পরিকল্পনায় আরেকটি দিক রয়েছে; প্রবীণ পরিচর্যার জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আশিক-উর-রহমান বলেন, ‘প্রবীণ পরিচর্যার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে। এতে দেশ ও বিদেশে তাঁরা কাজ করতে পারবেন।’

জাপানের কেয়ারগিভার বিশেষজ্ঞ কাজি সোগিমোতোর তত্ত্বাবধানে এখানে কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে কাজ করছেন জাইকার প্রতিনিধি সাইকা দোই ও ইউশিকো নিশিয়ামা।

জেবিএফআরএইচের প্রথম নিয়মিত বাসিন্দা বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি, বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এই শিক্ষাবিদ এখানে বিশেষ পরিচর্যায় আছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত বসবাস করছেন ৩৯ প্রবীণ। তাঁদের মধ্যে সাতজন হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিচ্ছেন।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার, বিষণ্নতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। ফলে প্রবীণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন সামনে আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এ ধরনের সেবার আরেকটি বাস্তবতা হলো খরচ। স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া, পাঁচ বেলার খাবার, চিকিৎসা, নার্সিংসহ মৌলিক ব্যয় মাসে প্রায় ৯৪ হাজার টাকা। স্থায়ীভাবে অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে খরচ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২৩২টি অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে প্রায় ১০০টি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে। ফলে এখনো এই ধরনের সেবা মূলত সচ্ছল প্রবীণদের নাগালে।

বার্ধক্য মানে নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়। যত্ন, সঙ্গ, নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ আর পরিচিত একটি নিরাপদ পরিবেশ; জীবনের শেষ অধ্যায়টিকেও এগুলো করে তুলতে পারে স্বস্তির। জেবিএফআরএইচের মতো উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত