Ajker Patrika

সকালের কেমো বাড়াতে পারে ক্যানসার রোগীর আয়ু: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ৫৭
সকালের কেমো বাড়াতে পারে ক্যানসার রোগীর আয়ু: গবেষণা
ছবি: সংগৃহীত

দিনের শুরুতে ক্যানসারের ইমিউনোথেরাপি দিলে রোগীর বেঁচে থাকার সময় বাড়তে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ বিষয়ে করা প্রথম র‍্যান্ডমাইজড কনট্রোলড ট্রায়ালে দেখা যায়, চিকিৎসা দেওয়ার সময়সূচি রোগীর ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক বিজ্ঞানবিষয়ক নিউ সায়েন্টিস্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আমাদের শরীরের কোষ এবং টিস্যুগুলো ২৪ ঘণ্টার একটি নির্দিষ্ট চক্র মেনে চলে, যাকে ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ (circadian rhythms) বলা হয়। এটি আমাদের মেজাজ থেকে শুরু করে বিপাক প্রক্রিয়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবকিছুকেই প্রভাবিত করে।

এর আগে এক ডজনের বেশি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ক্যানসার রোগী দিনের শুরুতে ‘চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর’ (ইমিউনোথেরাপির এমন এক ধরনের ওষুধ, যা নির্দিষ্ট রোগপ্রতিরোধী কোষকে ক্যানসার ধ্বংসে সহায়তা করে) গ্রহণ করেন, তাদের অবস্থার অবনতি হওয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

এবার ফ্রান্সের প্যারিস-স্যাকলে ইউনিভার্সিটির ফ্রান্সিস লেভি ও তাঁর সহকর্মীরা ‘ক্রোনোথেরাপি’ অর্থাৎ সার্কাডিয়ান রিদম অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার প্রভাব যাচাই করতে প্রথম র‍্যান্ডমাইজড কনট্রোলড ট্রায়াল পরিচালনা করেছেন। এতে ক্যানসারের জন্য কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির সমন্বিত ব্যবহার পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় নন-স্মল সেল ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত ২১০ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের সবাইকে পেমব্রোলিজুম্যাব বা সিনটিলিম্যাব নামক দুটি চেকপয়েন্ট ইনহিবিটরের চারটি ডোজ দেওয়া হয়। এই দুটি চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর একই পদ্ধতিতে কাজ করে।

প্রতি তিন সপ্তাহ পর অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেককে বিকেল ৩টার আগে ওষুধের ডোজ দেওয়া হয়েছিল আর বাকি অর্ধেককে দেওয়া হয় দিনের শেষভাগে। প্রতিটি ইমিউনোথেরাপি ডোজের অল্প সময় পর সবাইকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। কেমোথেরাপি দ্রুত বিভাজিত কোষগুলোকে ধ্বংস করে এবং ধারণা করা হয় যে, ইমিউনোথেরাপির তুলনায় ক্রোনোথেরাপির প্রভাব কেমোথেরাপিতে কম পড়ে।

এই সময়সূচি তাঁদের ‘ইমিউনোকেমোথেরাপি’র প্রথম চারটি চক্রে বজায় রাখা হয়। এরপর সব রোগীই একই ওষুধ পেতে থাকেন, যত দিন না টিউমার অবস্থার অবনতি হতে থাকে বা তাঁদের শরীর চিকিৎসায় সাড়া দেওয়া বন্ধ করে। তবে এ পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি।

চীনের সেন্ট্রাল সাউথ ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়ংচ্যাং ঝাং বলেন, আগের গবেষণাগুলো বলছে, প্রথম চারটি চক্রেই সময় নির্ধারণ করলে বেঁচে থাকার ফলাফলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।

গবেষকেরা প্রথম ডোজ দেওয়ার পর গড়ে ২৯ মাস ধরে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, যাঁরা শুরুতে বিকেল ৩টার আগে চিকিৎসা পেয়েছিলেন, তাঁরা গড়ে ২৮ মাস বেঁচে ছিলেন। আর যাঁদের চিকিৎসা দিনের শেষে শুরু হয়েছিল, তাঁদের গড় বেঁচে থাকার সময় ছিল ১৭ মাস। লেভি বলেন, ‘প্রভাবটা অবিশ্বাস্য। বেঁচে থাকার সময়ের পার্থক্য প্রায় দ্বিগুণ।’

যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির পাসকুয়ালে ইনোমিনাটো বলেন, ‘নতুন ওষুধ অনুমোদনের বড় বড় ট্রায়ালের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, খুব কম ক্ষেত্রেই ওষুধে এত প্রভাব দেখা যায়।’ তাঁর মতে, এই গবেষণার নকশা স্পষ্টভাবে দেখায় যে ক্যানসার চিকিৎসার সময় বদলালে ফলাফল সত্যিই ভালো হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি কার্যকারণ সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।’

গবেষকদের ধারণা, এই সুফল আসতে পারে টি-সেল নামের রোগপ্রতিরোধী কোষের আচরণ থেকে। গবেষক ফ্রান্সিস লেভি জানান, চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর যেসব টি-সেলকে লক্ষ্য করে, সেগুলো সাধারণত সকালে টিউমারের আশপাশে বেশি জমা থাকে এবং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দিনের শুরুতে যে সময় টি-সেলগুলো টিউমারের কাছাকাছি থাকে সে সময় ইমিউনোথেরাপি দিলে বেশি কার্যকরভাবে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে পারে।

লেভি বলেন, ভবিষ্যতে আরও সুনির্দিষ্ট সময়ে (যেমন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানের বদলে ঠিক সকাল ১১টায়) থেরাপি দিলে আরও সুবিধা পাওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত। তবে ইনোমিনাটো মনে করেন, হাসপাতালের ব্যস্ততার কথা বিবেচনায় নিলে বড় সময়-পরিসর রাখা অবশ্যই সুবিধাজনক।

এ ছাড়া প্রথম চার চক্রের পরেও কেমোইমিউনোথেরাপির সময় নিয়ন্ত্রণ করলে আরও বেশি সুফল পাওয়া যায় কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা দরকার বলে মনে করেন লেভি। তাঁর মতে, ব্যক্তিভেদে আদর্শ সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে। যেমন, সকালে তাড়াতাড়ি ওঠা মানুষ এবং রাতে দেরি করে ঘুমানো মানুষদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে ওঠানামা করতে পারে।

এই ফলাফল অন্য ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না, সেটি নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। ইনোমিনাটোর ধারণা, ত্বক ও মূত্রথলির মতো যেসব ক্যানসারে সাধারণত ইমিউনোথেরাপি ব্যবহার করা হয়, সেখানে ফলাফল কাছাকাছি হতে পারে। তবে প্রোস্টেট ও অগ্ন্যাশয়ের মতো যেসব টিউমার সাধারণত ইমিউনোথেরাপিতে সাড়া দেয় না, সেখানে শুধু সময়ের হেরফের করে ইমিউনোথেরাপিকে কার্যকর করা সম্ভব নাও হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত