Ajker Patrika

পরিবেশের ভারসাম্য ও জীবাণুর রূপান্তর: জনস্বাস্থ্যের জন্য অদৃশ্য মহাবিপদ

ডা. কাকলী হালদার
পরিবেশের ভারসাম্য ও জীবাণুর রূপান্তর: জনস্বাস্থ্যের জন্য অদৃশ্য মহাবিপদ
পরিবেশকে আমরা যে বিষ দিচ্ছি, তাই ঘুরে এসে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে। ছবি: পেক্সেলস

প্রতিবছর ৫ জুন ঘুরেফিরে আসে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ব্যানার, ফেস্টুন আর র‍্যালির চিরাচরিত আনুষ্ঠানিকতায় আমরা পরিবেশ রক্ষার কথা বলি। কিন্তু একজন চিকিৎসকের চোখে, বিশেষ করে একজন মাইক্রোবায়োলজিস্টের লেন্স দিয়ে যখন আমি এই চেনা পরিবেশের দিকে তাকাই, তখন কেবল প্লাস্টিকের বর্জ্য বা ধোঁয়া দেখি না; আমি দেখি এক অদৃশ্য, ভয়াবহ অণুজীব জগতের দ্রুত বদলে যাওয়া সমীকরণ। পরিবেশের অবক্ষয় কীভাবে আমাদের দোরগোড়ায় নতুন নতুন মহামারি আর প্রাণঘাতী জীবাণু ডেকে আনছে, তা আজ আর কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়, এক রূঢ় বাস্তবতা। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সরাসরি মূল্য চোকাচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য।

মাইক্রোবায়োলজির দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রকৃতিতে অণুজীব বা জীবাণুর একটা নির্দিষ্ট বাস্তুসংস্থান থাকে। মাটি, পানি ও বাতাসের নিজস্ব পরিবেশগত ভারসাম্যের কারণে এই জীবাণুগুলো কোটি কোটি বছর ধরে একটা নিয়মের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, শিল্পবর্জ্যের যত্রতত্র নিষ্কাশন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আমরা সেই চিরন্তন ভারসাম্যকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছি। ফলে প্রকৃতিতে থাকা নিরীহ বা সুপ্ত জীবাণুগুলো এখন বেঁচে থাকার তাগিদে নিজেদের জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটাচ্ছে এবং মানুষের জন্য অত্যন্ত সংক্রামক ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

এর বড় উদাহরণ হলো জুনোটিক ডিজিজ বা পশুপাখি থেকে ছড়ানো রোগ। যখন আমরা বনাঞ্চল কেটে সাফ করে দিই, তখন বন্য প্রাণী লোকালয়ে মানুষের সংস্পর্শে আসতে বাধ্য হয়। এতে বনের গহিনে যেসব ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া বাদুড়, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর শরীরে নিষ্ক্রিয়ভাবে বাস করত, তারা সহজেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। বিগত কয়েক দশকের ইবোলা, মারবার্গ, নিপাহ, জিকা এবং অতি সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারি—এর প্রতিটিই পরিবেশের ওপর মানুষের আগ্রাসনের সরাসরি ফল। পরিবেশের এই ক্ষত নিরাময় না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো রোগ বা অজানা মহামারির মুখোমুখি হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।

আমাদের বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের প্রভাব আরও প্রত্যক্ষ ও ভয়াবহ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মশার প্রজনন চক্র বদলে গেছে। বর্ষা আসার আগে মার্চ-এপ্রিল থেকে শুরু করে বছরের প্রায় প্রতি মাসেই এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। একইভাবে সুপেয় পানির অভাব ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের (জন্ডিস) মতো পানিবাহিত রোগের জীবাণুগুলো পানিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকছে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

প্লাস্টিক দূষণ এখন কেবল ড্রেন জ্যাম করার কারণ নয়; মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা এখন আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়েছে, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিপি ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার স্বাভাবিক শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে।

একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে আরেকটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় না বললেই নয়, তা হলো, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। এর সঙ্গেও পরিবেশ দূষণের এক গভীর সংযোগ রয়েছে। আমরা হাসপাতাল, পোলট্রি ফার্ম এবং কলকারখানার অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত বর্জ্য সরাসরি মাটি ও পানিতে ফেলছি। এই দূষিত পরিবেশে যখন ব্যাকটেরিয়াগুলো দিনের পর দিন বেঁচে থাকে, তখন তারা সেই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বা রেজিস্ট্যান্ট জিন তৈরি করে ফেলে। পরবর্তী সময়ে এই সুপারবাগ যখন সাধারণ মানুষকে আক্রান্ত করে, তখন দামি ও শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও রোগী বাঁচানো সম্ভব হয় না।

পরিবেশকে আমরা যে বিষ দিচ্ছি, তাই ঘুরে এসে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন ওয়ান হেলথ বা একক স্বাস্থ্য ধারণার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। এর মূল কথা হলো—মানুষের স্বাস্থ্য কখনোই একা ভালো থাকতে পারে না, যদি না পরিবেশ এবং পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে। মানুষের শরীর সুস্থ রাখতে হলে পৃথিবীর শরীর সুস্থ করতে হবে।

তাই এবারের পরিবেশ দিবসে আমাদের ভাবনা ও কাজের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শুধু গাছ লাগানোর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরির বায়ো-মেডিকেল বর্জ্য এবং রাসায়নিক তরল যেন কোনোভাবেই সরাসরি সাধারণ ড্রেন বা জলাশয়ে না মেশে, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। বায়োসেফটি বা জৈব-নিরাপত্তার নিয়মগুলো কেবল গবেষণাগারে নয়, জাতীয় পর্যায়ে বর্জ্য নিষ্কাশনেও মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

আমরা যদি এখনই পরিবেশ সচেতনতাকে আমাদের প্রতিদিনের যাপনে রূপান্তর করতে না পারি, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব অ্যান্টিবায়োটিক আর ভ্যাকসিনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুগুলো মানবসভ্যতাকে কোণঠাসা করে ফেলবে। পরিবেশ রক্ষা করা আজ আর কেবল প্রকৃতির প্রতি দয়া নয়, বরং মানুষের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত