Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /ভারতে খুন ও ‘অপহরণের’ ভিডিওকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দাবিতে প্রচার

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
আপডেট : ২৭ জুন ২০২৬, ১৮: ২২
ভারতে খুন ও ‘অপহরণের’ ভিডিওকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দাবিতে প্রচার
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা দাবিতে প্রচার। ছবি: স্ক্রিনশট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এবং ফেসবুকে দুটি পৃথক ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। এর মধ্যে একটি দাবিতে একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও শেয়ার করে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ এখন মৃত্যুর উপত্যকা এবং গত দুই বছরে এখানে ফিলিস্তিনের চেয়েও বেশি মানুষ মারা গেছে। অপর একটি দাবিতে ১২ সেকেন্ডের ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, কক্সবাজারে দিনদুপুরে এক নারীকে অপহরণ করেছেন যুবদল নেতা।

এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নেটিজেনদের অধিকাংশ ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশের মনে করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ভিডিওগুলো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও বর্তমান পরিস্থিতির দাবিতে ছড়ানো হলেও দাবিগুলোর পক্ষে কোনো তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ভিডিওগুলো ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার হলেও সেগুলোকে প্রকৃত প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন মৃত্যুর উপত্যকা দাবিতে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট
বাংলাদেশ এখন মৃত্যুর উপত্যকা দাবিতে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

‘মৃত্যুর উপত্যকা বাংলাদেশ’

‘𝐇.𝐌 𝐒𝐚𝐢𝐟𝐮𝐥𝐥𝐚𝐡’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে গতকাল (২৬ জুন) একটি ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, ‘বাংলাদেশ এখন মৃত্যুর উপত্যকা। এখানে কারও কোনো নিরাপত্তা নাই; ঘরে বা বাইরে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনেও এত মানুষ মরে নাই, গত দুই বছরে যত মানুষ মরছে বাংলাদেশে।’

ভিডিওটিতে এক নারীকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পেছন থেকে এক ব্যক্তিকে কাস্তেসদৃশ অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে দেখা যায়।

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড সার্চ করে দেশের কোনো গণমাধ্যমে এমন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে ‘thelegalsources__’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে চলতি বছরের ১৫ জুন শেয়ার করা ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, এটি ভারতের মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার একটি ঘটনা। একই তথ্য ও ভিডিও পাওয়া যায, আরও একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকেও।

ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট
ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

এই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘News18’-এ ১৩ জুন ‘Caught On Cam: Maharashtra Government Employee Stabbed Multiple Times In Neck, Back By Colleague’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মহারাষ্ট্র রাজ্যের পালঘর জেলা কালেক্টরেটের রাজস্ব বিভাগে কর্মরত স্নেহল সাওয়ান্ত (২৭) নামের এক নারী কর্মীকে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র (কুড়াল) দিয়ে একাধিকবার আঘাত করেন তাঁরই এক সহকর্মী। অভিযুক্ত ব্যক্তি আমোল মুলে আদালতের একজন পিয়ন। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া ঘটনাটি মূলত ব্যক্তিগত বিরোধ বা সম্পর্কজনিত কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে ঘটেছিল এবং গুরুতর আহত ওই নারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

অর্থাৎ ভারতের মহারাষ্ট্রে সংঘটিত অপরাধের ভিডিওকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

যুবদল নেতা কর্তৃক নারী অপহরণের দাবিতে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট
যুবদল নেতা কর্তৃক নারী অপহরণের দাবিতে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

কক্সবাজারে যুবদল নেতার নারী অপহরণ

‘Bornojoy News’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ২৬ জুন (শুক্রবার) ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হয়, কক্সবাজারে দিনদুপুরে এক নারীকে অপহরণ করেছেন যুবদল নেতা। একই দাবিতে আরও কিছু পোস্ট রয়েছে এখানে ( , , )।

ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিওতে একটি মুদিদোকানের সামনে থেকে এক তরুণীকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিতে দেখা যায়।

আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘The Statesman’-এর ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে ২৫ জুন ‘19 year old woman abducted by father in Gujarat’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে।

The Statesman-এর ইউটিউব ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট
The Statesman-এর ইউটিউব ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

ভারতীয় গণমাধ্যম টইমস অব ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে ২৫ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতের গুজরাট রাজ্যের ভাদগাম গ্রামে ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে তাঁর লিভ-ইন সঙ্গীর বাড়ি থেকে বাবা ও আরও তিনজন মিলে অপহরণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই তরুণী ও তাঁর সঙ্গী প্রায় দুই বছর ধরে সম্পর্কে ছিলেন। সম্প্রতি তাঁরা একটি লিভ-ইন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। তরুণীর সঙ্গীর দাবি, মেয়েটির বাবা এই সম্পর্কের বিরোধিতা করতেন এবং এর আগে তাঁর পরিবারকে হুমকিও দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিযোগ পাওয়ার পর নিখোঁজ তরুণীর সন্ধানে পুলিশ পাঁচটি পৃথক দল গঠন করেছে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।

টইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
টইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

অর্থাৎ ভারতের গুজরাটে পরিবারের অমতে লিভ-ইনে থাকা মেয়েকে জোর করে বাড়িতে নিয়ে যান বাবা। সেই ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারের বলে চালানো হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত