Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /ইরানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের সেনাদের আটকের ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
ইরানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের সেনাদের আটকের ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি
আলোচিত দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্সের একটি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে এবং বহু মার্কিন সেনা আটক হয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টগুলোতে আরও বলা হচ্ছে, এ ঘটনায় তেহরান বার্তা দিয়েছে—‘এটা ভেনেজুয়েলা নয়।’

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডেল্টা ফোর্স’ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফোরেসকে তুলে নিয়ে যায়। এ ছাড়া ১৯৮০ সালে ইরানে জিম্মিদের উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক অভিযান চালায়। ডেল্টা ফোর্সের ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ নামে সেই অভিযান ব্যর্থ হয়।

আলোচিত দাবিতে ফেসবুকে একাধিক ( , , ) পোস্ট পাওয়া গেছে। একই ধরনের পোস্ট ছড়িয়েছে ইনস্টাগ্রাম ( ) ও এক্সেও ( , , )।

Rasel Hawlader নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ৬ মার্চ সকাল ৭টার দিকে এ দাবিতে একটি পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স ইরানের ভেতরে গোপন অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে সেই অভিযান ব্যর্থ হয় এবং বহু মার্কিন সেনা ইরানের হাতে বন্দী হয়।

এই পোস্টটি আলোচিত দাবিতে ফেসবুকে সম্ভাব্য প্রথম পোস্ট এবং সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোর একটি। রোববার (৮ মার্চ) বেলা ১২টা ৪২ মিনিট পর্যন্ত এতে প্রায় ৬৪ হাজার রিয়েকশন, ৩ হাজার ৩০০ শেয়ার এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ কমেন্ট পড়েছে।

পোস্টগুলোর কমেন্ট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ব্যবহারকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ ঘটনাটিকে সত্য বলে মনে করেছেন, আবার কেউ ভুয়া খবর বলেও কমেন্ট করেছেন।

আলোচিত দাবিতে পোস্টের কমেন্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
আলোচিত দাবিতে পোস্টের কমেন্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, একই দাবিতে প্রচারিত চারটি ছবিতে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে।

প্রথম ছবিতে দেখা যায়, একটি হেলিকপ্টার থেকে কয়েকজন সেনা প্যারাসুট দিয়ে নামছেন। নিচে কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ছবিতে এক সেনার প্যারাসুট নিয়ে নামার দৃশ্য খেয়াল করলে দেখা যায়, ভূমি থেকে তাঁর উচ্চতা ও হেলিকপ্টারের উচ্চতার পার্থক্য খুব বেশি নয়। দেখা যায়, হেলিকপ্টার থেকে অপর একজন সেনা লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এত কম উচ্চতা থেকে সাধারণত সৈনিকদের হেলিকপ্টার থেকে জাম্প দিতে দেখা যায় না। পাশাপাশি অন্য এক সেনাকে প্যারাসুট নিয়ে নামার দৃশ্য খেয়াল করলেও দেখা যায়, তিনি খাদে নামছেন। সাধারণত হেলিকপ্টার থেকে সেনারা সমতলে অবতরণ করেন। ভূমি থেকে হেলিকপ্টারের উচ্চতা, সেনাদের অবস্থান ও ছবির সামগ্রিক বিন্যাস দেখে মনে হয়, ছবিগুলো এডিট করে বসানো হয়েছে।

দ্বিতীয় ছবিতে কয়েকজন মার্কিন সেনাকে পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। পাশে সামরিক পোশাক পরা মুখ ঢাকা অস্ত্রধারীদের দেখা যায়। তৃতীয় ছবিতে দেখা যায়, অস্ত্র ও মুখোশধারী ব্যক্তিদের সামনে সামরিক পোশাক পরা ব্যক্তিরা হাঁটু গেঁড়ে বসে আছেন। পেছনের দেয়ালে ইরানের জাতীয় পতাকা ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একটি বাধাঁই করা ছবি টাঙানো।

চতুর্থ ছবিতেও কয়েকজন সেনাকে নতজানু হয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। সেখানে অস্ত্রধারী সেনা ও ইরানের পতাকাও রয়েছে। তবে ছবিটি খেয়াল করলে দেখা যায়, একজন সৈনিকের তিনটি হাত। তিনি এক হাতে অস্ত্র ধরে আছেন, অপর দুই হাতে আপাতদৃষ্টিতে একটি দণ্ডে দুটি পতাকা ধরে আছেন। একই ধরনের পতাকার মধ্যে একটি স্বাভাবিক মনে হলেও অপরটিতে অসঙ্গতি রয়েছে। কেননা একটি পতাকার অংশ বিশেষ ভাঁজ হয়ে থাকলেও অপর পতাকাটি টানটান।

এ ছাড়া অপর এক সেনাকে খামেনির একটি পোর্ট্রেট ছবির একই পাশের দুই কোনা দুই হাতে ধরে রাখতে দেখা যায়। সাধারণ প্রিন্ট করা ছবির একপাশে দুই কোনা ধরে রাখলে সেটি এতোটা সোজা থাকার কথা না।

গ্রুপ ছবিটির ছায়াতেও অসঙ্গতি রয়েছে। একইস্থানে দাঁড়ানো ও বসা ব্যক্তিদের ছায়া একেক জনের একেক দিকে দেখা যাচ্ছে, এটি স্বাভাবিক নয়।

বিষয়টি নিশ্চিত হতে ফ্যাক্টচেক টিম এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Moderation (হাইভ মডারেশন)–এর সহায়তা নেয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যথাক্রমে ৯৯ শতাংশ, ৯৬ শতাংশ, ৮৬ শতাংশ ও ৯৯ শতাংশ।

ভাইরাল ছবির (১) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
ভাইরাল ছবির (১) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

ভাইরাল ছবির (২) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
ভাইরাল ছবির (২) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

ভাইরাল ছবির (৩) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
ভাইরাল ছবির (৩) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

ভাইরাল ছবির (৪) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
ভাইরাল ছবির (৪) এআই টেস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

এ ছাড়া প্রাসঙ্গিক কি–ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমেও এই দাবির পক্ষে কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়া যায়নি।

সিদ্ধান্ত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো এআই দিয়ে তৈরি। ইরানে ডেল্টা ফোর্সের অভিযানের কথা যুক্তরাষ্ট্রও জানায়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত