Ajker Patrika

‘সরকার অটো চালকদের পেটে লাথি দিচ্ছে’ দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি নয় বছরের পুরোনো

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
‘সরকার অটো চালকদের পেটে লাথি দিচ্ছে’ দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি নয় বছরের পুরোনো
অটোরিকশা বন্ধের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

সম্প্রতি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রতিবাদসহ চার দফা দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন অটোরিকশা চালকেরা। এরই মধ্যে রিকশা ভাঙার একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, অটোরিকশা বন্ধ করে রিকশাচালকদের পেটে লাথি দিচ্ছে সরকার।

আলোচিত দাবিতে কয়েকটি পোস্ট রয়েছে এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।

ছড়িয়ে পড়া পোস্টের কমেন্ট ও রিয়েকশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যবহারকারী দাবিটিকে সত্য মনে করেছেন। পোস্টের কমেন্টে একজন লিখেছেন, ‘এগুলো ভাই, মোনাফেকি হচ্ছে।’ অপর একজন লিখেছেন, ‘পুরোনোগুলো ভেঙে আবার নতুন আমদানি করব ভাই। ব্যবসা তো করতে হবে, ব্যবসা বন্ধ হলে চলবে কীভাবে?’

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

ভাইরাল ভিডিওটিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ভাঙচুর ও উচ্ছেদ করতে দেখা যায়। ভিডিওর ভয়েসওভারে দাবি করা হয়—রিকশা বন্ধের জন্য নয়, বরং চাঁদার হার বাড়িয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করার জন্যই এই অভিযান চালানো হচ্ছে। এ সময় চালকদের ওপর অত্যাচার না করে সরাসরি রিকশা আমদানিকারকদের ধরার কথা বলা হয় এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় সব রিকশাচালককে এক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া, ভিডিওতে ‘বগুড়ায় ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালায় পৌরসভা, পুলিশ ও বিআরটিএ’ লেখা এবং জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর লোগো দেখা যায়। তবে ভিডিওতে এক যুবক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে কথা বলতে দেখা গেলেও তাঁদের বক্তব্য শোনা যায় না।

ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধান করে সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়ায় এমন ঘটনার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে ‘ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান’ শিরোনামে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। এর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে। তবে প্রথম আলোর মূল ভিডিওতে কোনো ভয়েসওভার নেই। সেখানে যুবক ও পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে জানা যায়, ভিডিওটি ২০১৭ সালে বগুড়ায় অবৈধ অটোরিকশা উচ্ছেদ অভিযানের।

আজকের পত্রিকার তুলনাচিত্র
আজকের পত্রিকার তুলনাচিত্র

মূল সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক কালবেলায় ‘অটোরিকশা চলাচলে কঠোর দুই প্রশাসক, আইন না মানলে গ্রামে ফিরে যান’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকেরা রাজধানীর মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন জানান, ঢাকার সড়কে চলতে হলে আইন ও নির্ধারিত নিয়ম মানতে হবে। আইন না মানলে চালকদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য আলাদা আইন তৈরির সুযোগ নেই এবং কোনো অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হবে না। প্রশাসকেরা আরও জানান, জনস্বার্থের বিরুদ্ধে বা নগরীতে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা হলে তা নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনেও অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিমালা তৈরির উদ্যোগের কথা বলা হয়। বিশেষ করে ঢাকা শহরে জোনভিত্তিক রঙ ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া, ঢাকা মহানগরের গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো, সড়ক নিরাপত্তা এবং বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা দূর করার উপায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ বৈঠকের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

এদিকে, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ এবং গ্রেপ্তার চার নেতার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে গত ৫ অক্টোবর সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের পর মিছিল নিয়ে দৈনিক বাংলা মোড়ে যান। সেখানে সমাবেশ থেকে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়।

সমাবেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি এস এম আবুবকর সিদ্দিক বলেন, তাঁদের চার নেতাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া এবং রিকশা উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করা না হলে তাঁরা আরও কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেবেন।

তবে ঢাকায় বা দেশের কোথাও রিকশা ভেঙে ফেলার মতো কোনো সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।

সিদ্ধান্ত

সরকার অটোরিকশা বন্ধ করে চালকদের পেটে লাথি দিচ্ছে—এমন দাবিতে প্রচারিত রিকশা ভাঙার ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর। মূলত, ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার নয়; এটি ২০১৭ সালে বগুড়ায় অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের দৃশ্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত