Ajker Patrika

ফ্যাক্টচেক /হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া নারীর ফুটপাতে সন্তান প্রসবের ঘটনাটি নেপালের

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া নারীর ফুটপাতে সন্তান প্রসবের ঘটনাটি নেপালের
নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালে প্রসূতিকে সেবা না দেওয়ার দাবিতে প্রচারিত ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালে টাকা দিতে না পারায় এক প্রসূতিকে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি রাস্তার ওপর সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।

‘Alamin Zahid Nirjon’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে আজ (১৫ সেপ্টেম্বর) পোস্টটি শেয়ার করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, ‘নোয়াখালী সরকারি হাসপাতাল থেকে একজন মাকে টাকা না দেওয়ার কারণে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পেটের ব্যথায় রাস্তায় সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছেন—এটি শুধুমাত্র একটি পরিবারের দুঃখের ঘটনা নয়; বরং আমাদের স্বাস্থ্যসেবার মানহীনতা ও মানবিকতার ওপর একটি গুরুতর প্রশ্ন।

মধ্যরাতে রাস্তায় সন্তান জন্ম দেওয়া শুধু একজন দরিদ্র ব্যক্তির স্ত্রীকে বিনা চিকিৎসায় ফেরানোর বিষয় নয়, বরং এটি পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার একটি চিত্র, যা সারা দেশজুড়েই বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতি ঠিক করা বর্তমান সরকারের একটি বড় দায়িত্ব। কিন্তু সরকার আমার বাল করবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে আসছে।’

ছড়িয়ে পড়া পোস্টটির কমেন্টে নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। অনেকে দাবিটিকে সত্য ভেবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ এটি ভারতের ঘটনা কিংবা এআই দিয়ে তৈরি ছবি বলেও কমেন্ট করেছেন।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

প্রথমে প্রচারিত দুটি কোলাজ ছবি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বাম পাশের ছবিতে শাড়ি পরিহিত এক নারী ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। ডান পাশের ছবিতে এক নারীকে ফুটপাতের ওপর মাথা রেখে উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়, যাঁর পাশে একটি প্লাস্টিকের পানির বোতল ও শপিং ব্যাগ পড়ে আছে। এ সময় এক যুবক ও আরেক নারীকে হাঁটুতে হাত দিয়ে সামনে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

তবে ছবিটি পর্যবেক্ষণে আলোচিত ভুক্তভোগী ওই নারীর দুই পায়ের মাঝে আরেকটি মাথাসদৃশ বস্তু ও ডান হাত অস্বাভাবিক লম্বা দেখা যায়।

অনুসন্ধানে প্রচারিত দাবির বিষয়ে গণমাধ্যমে এমন কোনো তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া, গুগল স্ট্রিট ভিউ থেকে পাওয়া নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ছবির সঙ্গেও প্রচারিত ছবির মিল পাওয়া যায়নি।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কি না, তা যাচাই করতে একাধিক এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলের সহায়তা নেওয়া হয়। এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল ‘হাইভ মডারেশন’-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।

এআই বিশ্লেষণ। ছবি: স্ক্রিনশট
এআই বিশ্লেষণ। ছবি: স্ক্রিনশট

প্রচারিত দাবিটির সূত্রপাত কীভাবে?

বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে ‘সবুজ শক্তি’ নামের ফেসবুক পেজে হুবহু একই ছবি সংবলিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। তবে ১৩ সেপ্টেম্বর শেয়ার করা ওই পোস্টে হাসপাতালের বাইরে সন্তান জন্ম প্রসবের কথা বলা হলেও কোনো স্থানের উল্লেখ করা হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে নেপালের মূলধারার সংবাদমাধ্যম ‘অনলাইনখবর’ ও ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ -এর প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নেপালের ‘গজেন্দ্র নারায়ণ সিং সগরমাথা হাসপাতাল’-এ এরকম একটি ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ববিতা পাসওয়ান নামের এক দরিদ্র নারী প্রসববেদনা নিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স ২ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি খরচ করে আল্ট্রাসাউন্ডসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে বলেন। অর্থের অভাবে পরীক্ষা করাতে না পারায় এবং পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া নার্স ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিবারটি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে ভোরের দিকে হাসপাতালের বাইরে একটি ওষুধের দোকানের পাশে ফুটপাতে তিনি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

এ ছাড়া, অনলাইনখবরের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গেও আলোচিত ছবিটির দৃশ্যগত মিল পাওয়া যায়।

নেপালের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
নেপালের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

সিদ্ধান্ত

নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালে টাকা না পেয়ে প্রসূতিকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং সড়কে সন্তান প্রসবের দাবিটি সঠিক নয়। মূলত নেপালের একটি হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে এআই দিয়ে তৈরি ছবি নোয়াখালীর ঘটনা দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত