Ajker Patrika

অর্থনৈতিক উত্তরণ

রহমান মৃধা
অর্থনৈতিক উত্তরণ

টাকা আছে, ব্যবহার নেই। দেহ আছে, মন নেই। জায়গা আছে, যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। বন্ধু আছে, দেখা নেই। পা আছে, চলন নেই। মাথা আছে, তাতে আবার ঘিলু নেই! কী হবে এখন বাক্সভরা টাকা, সোনা, গয়না, বিশাল বসতবাড়ি এবং গাড়ি দিয়ে, যদি তা মন খুলে ব্যবহারই করতে না পারলাম? দুই বছর আগে করোনা মহামারি যখন মারাত্মক রূপ ধারণ করে, তখন প্রায়ই এমনটি মনে হয়েছে। মনে হয়েছে পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে। মনে হয়েছে খুব তাড়াতাড়িই সব শেষ হয়ে যাবে।

ইন্ডাস্ট্রিগুলো একের পর এক বন্ধ হয়েছে তখন। রেস্টুরেন্টে কোনো লোক ছিল না, ট্যুরিস্টদের আনাগোনা ছিল বন্ধ। বয়স্ক লোকদের ঘরের বাইরে দেখা যায়নি। সব থাকতেও কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। মনে হতো, সবাই বেঁচে মরে আছি। কিন্তু কেন এমনটি হয়েছিল?
পৃথিবী সৃষ্টির পর নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন মানুষ জাতি হয়েছে। সব সমস্যার সমাধান মানুষ এখনো করতে পারেনি। যেমন খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা—এর সবই কিন্তু মৌলিক চাহিদা। অন্যদিকে আমরা আমাদের সামর্থ্যের বাইরেও অনেক কিছুর সমাধান করছি।

মনে হচ্ছে একে একে সব ধাপ পার না হয়ে লাফ দিয়ে কয়েকটি ধাপ ওপরে উঠেছিলাম। তাই যে কাজগুলো শেষ না করে এসেছি, তার ওপর হোমওয়ার্ক করা দরকার। যেমন মৌলিক চাহিদাগুলোর সমাধান করা। আজ যদি মৌলিক চাহিদাগুলোর যথাযথ সমাধান করা হতো, তাহলে পৃথিবীর অবস্থা এমনটি হতো না।

সামান্য একটি ভাইরাস সবকিছু লন্ডভন্ড করে ফেলছিল মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে। তখন মনে হয়েছে, এত যুগ ধরে যা করেছি তাসের ঘরের মতো তার সবকিছু ভেঙে যেতে শুরু করেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে যেখানে ছিলাম, সেখানে কি আবার ফিরে যেতে পারব আমরা? পারলেও কত দিন, কত মাস বা কত বছর লাগবে—কেউ কি তা আজ এ মুহূর্তে বলতে পারবে?

মানুষ সত্যি বড় ভয়ংকর জাতি। তা না হলে এমন হবে কেন? এখনো অনেক দেশে না খেয়ে মানুষ মরছে, এখনো হাজারো শিশু জন্মের শুরুতেই ঝরে পড়ছে, এখনো অনেকের রয়েছে প্রচুর সম্পদ, তা সত্ত্বেও তারা দিতে শেখেনি। শিখেছে শুধু দুর্নীতি করতে আর নিতে। কী হবে এত সব প্রাচুর্য থেকে যদি সত্যিই তার সঠিক ব্যবহার আর কোনো দিন না হয়?

যা-ই হোক, আমাদের এখন মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর সমস্যা মানে বাংলাদেশেরও সমস্যা। করোনায় হয়তো বিশ্বের কয়েক কোটি লোক মারা গেছে, সেটা শেষ না হতেই বিশ্বায়নে বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেছে! গার্মেন্টস, ইন্ডাস্ট্রিগুলো বন্ধ হওয়ার অবস্থা, কোটি কোটি মানুষ বিশ্বজুড়ে রয়েছে, যাদের পেটে এখনো খাবার জোটে না দিনে একবার। যদি এখন এই বিশ্বযুদ্ধ আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করে এবং ইউক্রেনের মতো সারা বিশ্বে ক্রাইসিস সৃষ্টি হয়, তবে কী হবে গোটা বিশ্বের? কী হবে অভাগা বাংলাদেশের এবং এক কোটির বেশি বাংলাদেশি যারা দূরপরবাসে বসবাস করছে, যদি তারা দেশে ফিরে আসে? কী নিয়ে তারা দেশে ফিরবে? রেমিট্যান্স, নাকি হাহাকার? পৃথিবীতে আমরা পাশাপাশি বাস করছি বটে, কিন্তু মনের দিক থেকে রয়েছি অনেক দূরে, বহু দূরে।

এত কিছুর পরও অর্থনৈতিক উত্তরণে বাংলাদেশ যখন প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাজারে প্রবেশের জন্য যাচ্ছে, তখন আমাদের দেশের ভাবমূর্তির প্রসঙ্গটি সামনে আসছে। এ সময় যদি গণতান্ত্রিক চর্চার দিকটি যথাযথ না হয়, তাহলে বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হবে।

অতীতে মার্কিন প্রশাসনের বৈশ্বিক নীতিতে অগ্রাধিকারে ছিল সন্ত্রাসবাদ দমন। নতুন মার্কিন প্রশাসনের বৈশ্বিক নীতির প্রধান অগ্রাধিকার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের লড়াই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বুঝিয়ে দিচ্ছে, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার গণতন্ত্রে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশকেও মনে রাখতে হবে, আগামী দিনে গণতন্ত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি জোর দেবে। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে দৃষ্টিভঙ্গি ও বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে যে গভীরতা প্রয়োজন, তাতে আমাদের বেশ ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরের পাশাপাশি সামাজিক স্তরেও বিদ্যমান। আশা করি, বিষয়গুলোর দিকে সরকার বিশেষ নজর দেবে।

লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ইসহাক, শেরেবাংলার নাতনি ফ্লোরা

শাহবাগ থানা চত্বরে ডাকসুর দুই নেতাকে মারধর

রাজশাহী-ঢাকা রুটে এসি বাসের ভাড়া বাড়ল ২০০ টাকা

শাহবাগ থানা চত্বরে ধাক্কা–ধাক্কির শিকার কয়েকজন সাংবাদিক

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে গণভোটের প্রচারের কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত