Ajker Patrika

বাংলাদেশের বন্ধু অঁদ্রে মালরো

ড. এম আবদুল আলীম
আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২১, ১১: ০৩
বাংলাদেশের বন্ধু অঁদ্রে মালরো

ফরাসি লেখক অঁদ্রে মালরো ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন ছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে পালন করেন অসামান্য ভূমিকা। তিনি মানবের দুঃখ-দুর্দশায় যেমন বিচলিত হয়েছেন, তেমনি তা লাঘবে কাজ করেছেন নিরলসভাবে। এমনকি বিভিন্ন যুদ্ধে পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেছেন, গুলি ছুড়েছেন নাৎসি বাহিনীর দিকে। একজন প্রতিভাবান লেখক হিসেবে রচনা করেছেন সমৃদ্ধ সাহিত্য। সক্রিয় ছিলেন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। খ্যাতি অর্জন করেন প্রত্নতত্ত্ব ও শিল্পকলার রসজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবেও। অলংকৃত করেন ফ্রান্সের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর পদ। সবকিছুর ওপরে ছিলেন মানবতাবাদী; অর্থাৎ বিপন্ন মানবতার পক্ষে ছিলেন অতন্দ্র প্রহরী।

অঁদ্রে মালরোর জন্ম প্যারিসের মোমার্ত এলাকায়, তারিখটি ছিল ১৯০১ সালের ৩ নভেম্বর। তাঁর পূর্বপুরুষদের বসতি ছিল ফ্রান্সের দঁকের্ক অঞ্চলে, প্রপিতামহ ছিলেন মাছ ধরা জাহাজের মালিক। পিতা ফেরনঁ-জর্জ ছিলেন ফরাসি সেনাবাহিনীর ছোটখাটো অফিসার। ১৯০৫ সালে পিতামাতার সংসার ভেঙে গেলে মালরো মায়ের সঙ্গে চলে যান বোঁদির শহরতলিতে। পল্লির নির্মল প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিকতায় কাটে তাঁর শৈশব-কৈশোর। স্কুলে পড়ার সময়েই সাহিত্যে অনুরাগী হন, পড়ে ফেলেন আলেকজান্ডার ডুমার ‘জর্জ’ উপন্যাস এবং শেক্‌সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ নাটক। পরবর্তীকালে লেখক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাড়া জাগানো আত্মজীবনী ‘অতিমেমোয়ার’; জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ বই ছিল ‘লে শেন কোঁ আবা’।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেসব বিদেশি নাগরিক প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের মধ্যে অঁদ্রে মালরোর নাম স্মরণীয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বাঙালির ওপর নারকীয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ এবং বাঙালির অমিতবিক্রমী যুদ্ধের খবর বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যায়। বিশ্ববাসী সহযোগিতার হাত বাড়ায়, বিপক্ষেও অবস্থান নেয় অনেক শক্তিধর রাষ্ট্র। পাকিস্তানিদের নির্মমতা বিশ্বমানবতাকে ব্যথিত করে। নানাভাবে তাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়ান। এগিয়ে আসেন ফরাসি চিন্তাবিদ অঁদ্রে মালরো। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করে একটি বিবৃতি দেন। শুধু তা-ই নয়, বাঙালিদের পক্ষে গঠিত মুক্তিবাহিনীর একটি ইউনিটের তিনি দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নিজের যুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে কাজে লাগানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তাঁর ছিল ট্যাংক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, তা-ও কাজে লাগাতে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে একটি ট্যাংক ইউনিটে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। বিবৃতিতে বাঙালির প্রয়োজনে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণের আগ্রহও প্রকাশ করেন। একের পর এক বিবৃতি ও সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। বাঙালির মুক্তির লড়াইকে তিনি নিত্য আলোচনার বিষয়ে পরিণত করেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে চিঠি লেখেন। তিনি পাকিস্তানিদের যুদ্ধ বন্ধ করতে আহ্বান জানাতে বলেন এবং তাদের সাহায্য দেওয়া বন্ধ করতে বলেন। ওই সময় এটা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর এহেন তৎপরতায় ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। অনেকে তাঁকে চিঠি দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে আসতে পারেননি। কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে খবর দেন যে, তিনি শিগগিরই ফ্রান্সে যাবেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। ইন্দিরা গান্ধী ফ্রান্সে গিয়ে মালরোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবেন। কিন্তু মালরোর তাতে তর সইছিল না, তিনি একের পর এক বিবৃতি দিতে থাকেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বজনমত গঠন করেন। পরে একজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এরপর ভারত সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করলে অল্পদিনের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মালরো বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন। এবার তিনি সরাসরি বাংলার মাটিতে চলে আসেন এবং এ দেশের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হন। ১৯৭৩ সালের ২১ এপ্রিল তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন। বিমানবন্দরে তাঁকে জানানো হলো প্রাণঢালা অভ্যর্থনা; পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শাহীন স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্লোগানে স্লোগানে তাঁকে বরণ করে। আবেগাপ্লুত মালরো একটি শিশুকে কোলে তুলে নেন এবং তাকে আদর জানিয়ে বাংলাদেশের সব মানুষকে তাঁর প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানান। বিমানবন্দর থেকে মালরো যান বঙ্গভবন ও গণভবনে, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তারপর যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে। তাঁকে দেওয়া হলো একটি রুপার নৌকা। এরপর মালরোর আবেগময়ী বক্তৃতায় পুরো অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধিকার-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আত্মত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এ ছাড়া তিনি আরও কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তাঁর সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

১৯৭৩ সালের ২২ এপ্রিল অঁদ্রে মালরোর সম্মানে বিশেষ সমাবর্তনের আয়োজন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সমাবর্তনে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি প্রদান করা হয়। ঢাকায় ফিরে তিনি জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করেন এবং চট্টগ্রাম সফরে যান। চট্টগ্রামবাসী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। অভ্যর্থনার জবাবে তিনি এক আবেগঘন বক্তৃতা দেন। তিনি ইউনিফর্মবিহীন যোদ্ধাদের দীর্ঘ ও মহৎ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি স্টালিন, হিটলার এবং মাও সে-তুংয়ের কাতারে ফেলতে নারাজ; কারণ তাঁরা ছিলেন একনায়ক আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন জননায়ক। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন, তাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের যত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, বিশ্ববাসী তার অল্পই জানে। তাই সবাইকে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ট্যাংকের চেয়েও শক্তিশালী’ বলে অভিহিত করেন। ঢাকা ত্যাগ করার প্রাক্কালে তিনি বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অঁদ্রে মালরোর সীমাহীন শ্রদ্ধা ছিল। বঙ্গবন্ধুকে তিনি তুলনা করেছেন বিখ্যাত বীর সালাদিনের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা তাঁকে বেদনাহত করে। এক সাক্ষাৎকারে মালরো তাঁর সুহৃদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। ১৯৭৬ সালের ২৩ নভেম্বর মালরো মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের বন্ধু অঁদ্রে মালরো চিরদিন বাঙালির শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবেন।

লেখক: ড. এম আবদুল আলীম গবেষক-প্রাবন্ধিক, শিক্ষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত