ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা, মানিকগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরা উৎসব

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পলো হাতে নদী ও জলাশয়ে নেমে পড়েন নানা বয়সী মানুষ। কারও পলোতে ধরা পড়ে বোয়াল, শোল কিংবা রুই, কেউ ফেরেন খালি হাতে। মাছ শিকারের আনন্দ, হাসি-আড্ডা আর বন্ধু-স্বজনদের মিলনমেলায় তৈরি হয় উৎসবের আবহ। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো দিয়ে মাছ শিকারের সংস্কৃতি।
আজ শুক্রবার ভোরে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের তরা, মির্জাপুর ও রাথুরা চকের জলাশয়ে শতাধিক শৌখিন মৎস্যশিকারি পলো দিয়ে মাছ শিকারে অংশ নেন। একই দিন উপজেলার ইছামতী শাখা নদীতেও বসে পলোবাইচের আসর। উথুলী ইউনিয়নের বারাদিয়া এলাকা থেকে শুরু হয়ে করজনা সেতু এলাকা পেরিয়ে ঘিওরের ঠাকুরকান্দি গ্রামের কাছে গিয়ে শেষ হয় প্রায় তিন কিলোমিটার নদীপথের এই আয়োজন। এতে অংশ নেন অন্তত ৩০০ মৎস্যশিকারি। এর আগের দিন শোলধারা ও নয়াচর এলাকার জলাশয়েও চলে মাছ শিকার।

পলোবাইচের খবর ছড়িয়ে দিতে কোথাও হাটবাজারে ঢাকঢোল পেটানো হয়, কোথাও চলে মাইকিং। খবর পেয়ে পলো হাতে নির্ধারিত স্থানে হাজির হন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। মাছ ধরার পাশাপাশি বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়া এবং পুরোনো ঐতিহ্যের অংশ হতে পেরে উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণকারীরা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসজুড়ে জেলার অন্তত শতাধিক স্থানে এমন আয়োজন হওয়ার কথা রয়েছে।
মৎস্যশিকারি ইসলাম খান বলেন, পলো দিয়ে মাছ ধরার আনন্দ অন্য রকম। এখানে মাছ পাওয়ার পাশাপাশি বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে দেখা হয়, সবাই মিলে আনন্দ করা যায়। এই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়।
আরও এক মৎস্যশিকারি মাহফুজ ভূঁইয়া বলেন, ‘মাছ কম পেলেও পলো নিয়ে জলাশয়ে নামার আনন্দ কমে না। কে বড় মাছ পেল, তা নিয়ে সবার মধ্যে আনন্দ, আলোচনা চলে। প্রতিবছর এমন আয়োজনের অপেক্ষায় থাকি।’
ঘিওরের প্রবীণ বাসিন্দা বারেক মিয়া বলেন, আগে জলাশয়ে দেশি মাছের প্রাচুর্য ছিল। পলো নিয়ে নামলে অনেকেই বড় মাছ পেতেন। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ দল বেঁধে আসতেন। এখন অনেক জায়গায় মাছ কমে গেছে, তবু মানুষ ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
ঘিওরের প্রাকৃতিক কৃষিকেন্দ্রের পরিচালক দেলোয়ার জাহান বলেন, ‘পলোবাইচ আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির অংশ। এই আয়োজন টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি জলাশয় ও দেশি মাছ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
একসময় কার্তিক থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত পানি কমে এলে নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে পলো দিয়ে মাছ ধরার ধুম পড়ত। মানিকগঞ্জের ইছামতী, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, গাজীখালী ও কান্তাবতী নদীতেও এমন আয়োজন হতো। এখনো এ চর্চা রয়েছে, তবে আগের তুলনায় অনেক কম।
বেসরকারি কৃষি, পরিবেশ ও মৎস্য গবেষণা সংস্থা বারসিকের মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, পলোবাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখতে জলাশয় ও দেশি মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কারেন্ট জালের ব্যবহার, পোনা মাছ ধরা, পানি সেচে মাছনিধন ও বিষ প্রয়োগের কারণে দেশি মাছের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমছে।
বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস আর আনসারী বিলটু বলেন, পলো দিয়ে মাছ ধরা শুধু মাছ শিকারের আয়োজন নয়, এটি গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা লোকজ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। জলাশয় ও দেশি মাছ রক্ষা করা গেলে টিকে থাকবে এই ঐতিহ্যও।









