Ajker Patrika

ইমরান আর রাহুলের মিল যেখানে

হামিদ মীর
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৩, ১০: ৩৩
ইমরান আর রাহুলের মিল যেখানে

ইমরান খান ও রাহুল গান্ধীর মধ্যে কি আদৌ মিল আছে? পাকিস্তান ও ভারতের কিছু মানুষ গত বছর এই দুজনের মধ্যে মিল খুঁজতে শুরু করে দিয়েছিলেন, যখন উভয় বিরোধী নেতা আটার ওজন মেপে ছিলেন লিটারে, যা কিনা তরল পদার্থ মাপার একক।  

তাঁর শাসনামল এবং শাহবাজ শরিফের আমলের আটার দামের তুলনা করার সময় পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, ‘আটার দাম দ্বিগুণ হওয়ায় জনসাধারণ সমস্যায় পড়েছে। আমাদের সময়ে এক কিলোগ্রাম আটার দাম ছিল ৫০ রুপি, আর আজ সেটা প্রতি লিটারে ১০০ রুপি ছাড়িয়ে গেছে।’

এদিকে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী দিল্লিতে এক জনসমাবেশে দেওয়া ভাষণে ২০১৪ সালের ও ২০২২ সালের আটার দামের তুলনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রতি লিটার আটা আগে ছিল ২২ রুপি এবং এখন এটি প্রতি লিটার ৪০ রুপি।’ তখন কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন যে উভয় নেতা বোধ হয় একই বই থেকে পড়েছেন যে  ‘আটার পরিমাপ করা হয় লিটারে।’

তাঁদের মধ্যে আরও অনেক বিষয়ে মিল রয়েছে। ইমরান খান নিখুঁত উর্দু বলতে পারেন কিন্তু ঠিকমতো পড়তে পারেন না।  এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমের কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী, পার্লামেন্টে হিন্দি পড়ার জন্য রাহুল রোমান হরফ ব্যবহার করেন।

ইমরান খান ও রাহুল গান্ধী দুজনই পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত। ইমরান খান অক্সফোর্ড এবং রাহুল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন।  ইমরান খানকে গত বছর পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন সব সরকারি পদে অযোগ্য ঘোষণা করে। গুজরাটের একটি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর রাহুলকেও সম্প্রতি সংসদ সদস্য পদে থাকার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ইমরান খানকে এক মেয়াদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও পাকিস্তানের আদালত তাঁকে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দিয়েছেন। রাহুলেরও কি ইমরানের মতো আদালত থেকে ছাড় মিলবে?

আমরা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ইমরান খানের রাজনীতির তুলনা করতে পারি, কিন্তু ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের তুলনা করতে পারি না। ভারত দেখেছে রাহুল গান্ধীর দাদি ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা মাত্র একটি জরুরি অবস্থা এবং ভারতীয় গণমাধ্যম খুব অল্প সময়ের জন্য কঠোর সেন্সরশিপের স্বাদ পেয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানিরা চার চারটি সামরিক শাসন দেখেছে। স্বাধীনতার ৭৬ বছরের মধ্যে ৩৩ বছরই পাকিস্তান সেনাশাসনে ছিল।

পাকিস্তানের আদালত সব সময়ই সামরিক স্বৈরশাসকদের হুকুমের কাছে মাথা নত করেছে। শুধু একজন সাহসী বিচারপতি ছিলেন, বিচারপতি ওয়াকার শেঠ, যিনি ২০১৯ সালে পাকিস্তানের সর্বশেষ সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক রায় লিখেছিলেন। মোশাররফের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর করার মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ চিরতরে বন্ধ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ ছিল সেটি।

 দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তখন ইমরান খান ক্ষমতায় ছিলেন এবং তাঁর সরকার আদালতের ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে। পাকিস্তানের সংবিধান বাতিলের জন্য একজন স্বৈরশাসককে ফাঁসি দিতে চেয়েছেন—এমন বিচারককে অপসারণের জন্য ইমরান খানের সরকার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ইমরান খান তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সহায়তায় মোশাররফকে রক্ষা করেন এবং একই বছর তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করেন। এখন, ইমরান প্রতিদিন জেনারেল বাজওয়াকে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী করেন। সামরিক বাহিনী তাঁকে ক্ষমতা দিলেও ইমরান খান ‘নয়া পাকিস্তান’ তৈরি করতে ব্যর্থ হন। তিনি এখন নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে ব্ল্যাকমেল 
করে আবারও ‘নয়া পাকিস্তান’ বানাতে উদ্যোগী হয়েছেন।

ইমরান খান রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে চান না। তিনি চান সেনাবাহিনী শাহবাজ শরিফকে সমর্থন করা বন্ধ করুক। তাঁকে আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে সহায়তা করুক। তিনি প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভির মাধ্যমে নতুন সেনাপ্রধানের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নতুন সেনাপ্রধান এই বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, ‘আমি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চাই।’

ইমরান খান এবং রাহুল গান্ধীর মধ্যে বড় পার্থক্য কী?  ইমরান খান এখনো বিশ্বাস করেন যে তিনি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর সাহায্যে ক্ষমতায় আসার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না রাহুল। এখানে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, আসলে ইমরান খান এবং রাহুল গান্ধীর মধ্যে কোনো তুলনা চলে না। আমরা ইমরান খানকে কেবল পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে তুলনা করতে পারি, যিনি ২০১৭ সালে আজীবনের জন্য নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন।

সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় আসেন নওয়াজ শরিফ। তিনি সেসব বিচারকের দ্বারা অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন, যাঁরা ছিলেন কিছু জেনারেলের হাতের পুতুল। পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে নোংরা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন ইমরান খান। ২০১৮ সালে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জালিয়াতির নির্বাচনে তাঁকে ‘নির্বাচিত’ করা হয়েছিল, তিনি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হননি।  সামরিক নেতৃত্ব তাঁর বিরুদ্ধে চলে যাওয়ায় পার্লামেন্টে অনাস্থার মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।  নওয়াজ ও ইমরান সামরিক বাহিনী দ্বারা লালিত-পালিত হয়েছেন এবং উভয়ই তাদের পালনকর্তার ক্ষোভের মুখে পড়েন।

নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ১৩ দলীয় জোটের নেতা। তিনি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর নামে ইমরান খানকে চিরতরে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ সম্প্রতি বলেছেন, ‘ইমরান খান দেশের রাজনীতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, যেখানে আমাদের মধ্যে একজনই থাকতে পারে।’  ইমরান খান ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি যে একটি মাদক চোরাচালান মামলার মুখে পড়েছিলেন, তার প্রতিশোধ নিতে চান।

আসল বিষয়টি হলো, ১৩ দলীয় ক্ষমতাসীন জোট একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ইমরান খানকে পরাজিত করার অবস্থানে নেই এবং সে কারণেই ইমরান খান আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। ৩০ এপ্রিল সাধারণ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করতে তিনি পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দিয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন এই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন বিলম্বিত করেছে। এখন, ইমরান খান আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উচ্চতর আদালতের সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এখানে সুস্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। সামরিক বাহিনী শাহবাজ শরিফের পেছনে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু অনেক বিচারক প্রকাশ্যে ইমরানকে সমর্থন করছেন, কারণ তার অর্থ এই নয় যে, তারা সংবিধানের সর্বোচ্চতায় বিশ্বাসী। তারা ইমরান খানকে সমর্থন করছে, কারণ পাকিস্তানের বর্তমান প্রধান বিচারপতি উমর আত্তা বান্দিয়াল এ বছরের সেপ্টেম্বরে অবসর নেবেন এবং তারপরে কাজী ফয়েজ ইসা নতুন প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেবেন, যিনি ইমরান খান ক্ষমতায় থাকাকালে অযোগ্যতার রেফারেন্স থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। খানপন্থী সব বিচারকই কাজী ফয়েজ ইসার বিরোধী।  

ইমরান খান খুব চতুরতার সঙ্গে তাঁর তাস খেলছেন। তিনি গত বছর জনগণের সহানুভূতি পেতে মার্কিনবিরোধী কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। আর এখন মার্কিন মিডিয়া ও রাজনীতিবিদদের সমর্থন জোগাড় করতে কিছু আমেরিকান লবিস্টকে ব্যবহার করছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থন এসেছে একজন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জালমে খলিলজাদের কাছ থেকে, যিনি ইমরান খানকে অযোগ্য ঘোষণার বিরোধিতা করেছেন।

তবে এই অপ্রত্যাশিত সমর্থন প্রকৃতপক্ষে ইমরান খানের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে, কারণ খলিলজাদ আফগানিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করার সময় সব সময় পাকিস্তান এবং তালেবানের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ওয়াশিংটনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ঘোষণা করার জন্য। ইমরান খান ক্ষমতায় থাকাকালে পাকিস্তান সরকার তাঁর বক্তব্যে অনেকবার বিরক্তি প্রকাশ করেছে। খলিলজাদকে ইমরান খানের সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা অহংকারী এবং শত্রু বলে ঘোষণা করেছিলেন। খলিলজাদ আফগান তালেবান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দোহা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। দোহা চুক্তি লঙ্ঘন করে তালেবান ২০২১ সালের আগস্টে কাবুল দখল করে এবং এ কারণে খলিলজাদকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। ইমরান খান সব সময় আফগান তালেবানকে সমর্থন করতেন এবং তাঁর সমালোচকেরা তাঁকে ‘তালেবান খান’ বলে ডাকতেন।  সেই  তালেবান খানের সমর্থনে খলিলজাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো এই ধারণাকে উড়িয়ে দিয়েছে যে ইমরান খানের সরকারের পতন ঘটেছে একটি আমেরিকান ষড়যন্ত্রের কারণে।  

পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়ে হতাশ ইমরান খান। এখন তিনি আমেরিকানদের সঙ্গে তাঁর ভাগ্য পরীক্ষা করছেন। তাঁর লবিস্টরা মার্কিন সিনেটরদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ব্যবস্থা করার এবং নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত মার্কিন মিডিয়াকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। প্রথমত, তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে চাপে ফেলার জন্য একটি মার্কিনবিরোধী কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। এখন, তিনি তাঁর পুরোনো প্রভুদের চাপে ফেলার জন্য কিছু মার্কিন লবিস্টকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। তিনি নিজেও ক্ষমতায় ফেরার খুব একটা সম্ভাবনা দেখছেন না।

তিনি আরও একটি অযোগ্যতার ঘোষণা এবং গ্রেপ্তারের জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত। তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারলেও সেনাপ্রধানের সমর্থন ছাড়া পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কীভাবে দেবেন? তিনি কি প্রথমে বর্তমান সেনাপ্রধানকে সরিয়ে নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে সেনাপ্রধান বানাবেন? মনে রাখতে হবে,  তিনি ভারতে নয়, পাকিস্তানে আছেন।

ইমরানের জন্য একটিমাত্র উপায় আছে এবং সেটা হচ্ছে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমস্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা। তিনি কিছু বিচারক এবং মার্কিন লবিং সংস্থার সহায়তায় সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করতে পারবেন না। তাঁর বিরোধীদেরও বুঝতে হবে যে ইমরান খানকে অযোগ্য ঘোষণা বা গ্রেপ্তার করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।

আমি আদালতের মাধ্যমে পাকিস্তানে অনেককে অযোগ্য ঘোষণা করতে দেখেছি। আমি অবশ্যই বলব যে এইসব ঘোষণা ষড়যন্ত্রমূলক এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল এবং এতে আরও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ইমরান খান অতীতে সেই কারসাজি ও ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন। কিন্তু অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে। ইমরান খানকে অযোগ্য ঘোষণা করে পাকিস্তানে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। আসুন, আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যাই। 

লেখক: পাকিস্তানি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

(ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় প্রকাশিত হামিদ মীরের লেখাটি আজকের পত্রিকার জন্য অনুমতি সাপেক্ষে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক ও কলাম লেখক রোকেয়া রহমান) 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত