রাজনীতি আর সংস্কৃতি যখন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে, তখন সমাজের এগিয়ে চলা দৃষ্টিগোচর হয়। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ জানেন, জনগণের রুচিবোধ তৈরি করার একটা দায় তার থাকে। কিন্তু যখন রাজনীতি মনে করে, সংস্কৃতির কাছে তার আর কোনো দায় নেই, তখনই জনমনে জায়গা করে নেয় স্থূলতা। স্থূলতার রাজত্বে তখন সূক্ষ্ম রুচিবোধ বিনষ্ট হতে থাকে। সংস্কৃতি রাজনীতির কাছে নতজানু হলে সে তার সৃষ্টিশীলতা নিয়ে আর টিকে থাকতে পারে না। সে হয়ে ওঠে ফরমায়েশি। আমাদের বর্তমান সময়ে নাজুক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বুঝিয়ে দেয়, মানুষের মননশীলতা ও সৃজনশীলতায় চলছে ভাটার টান।তিনটি ভিন্ন ঘটনা নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলব এখন।
দুই.
আমাদের রুচির জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে গেছে অনেক আগে। সেটাকে সুস্থ করার কোনো পথ আছে কি না, সেটা আমাদের জানা নেই। তবে কেউ কেউ বলছেন, ইদানীং চলচ্চিত্রে সুবাতাস বইছে। চলচ্চিত্রে সুবাতাস বলতে গত ঈদে তিনটি ছবির মুক্তি এবং এই তো কিছুদিন আগে ‘হাওয়া’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর অনেকের মনে হচ্ছে দর্শক আবার হলমুখী হয়েছেন। কথাটা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু এই সুদিন ঠিক কোথায় এসেছে, কতটা ছড়িয়েছে এবং আগে যাঁরা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতেন, তাঁরা আবার হলে ফিরতে শুরু করেছেন কি না, সে সংশয় আমাদের কাটেনি।
সিনেমা দেখতে হয় সিনেমা হলে বসে। অল্প কয়েকটি শহরে সিনেপ্লেক্সের সুন্দর পরিবেশে বসে সিনেমা দেখা যায় বটে, কিন্তু দেশের বেশির ভাগ জেলা শহরেই তো সিনেমা হল নেই বললেই চলে। সৃজনশীল মানুষ অনেক পরিশ্রম করে যে ছবি তৈরি করেন, দর্শক সেই সিনেমা দেখবেন কোথায়? দেড় যুগ ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে একটি সিনেমা হলও নেই। আছে মৌলবাদীদের হুংকার। এ রকম জেলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিভিন্ন জেলায় যেসব সিনেমা হল আছে, সেই হলগুলোর পরিবেশ, আসনব্যবস্থা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা ইত্যাদি এতটাই নাজুক যে খুব কম মানুষই মনে আনন্দ নিয়ে সেই সব হলে গিয়ে সিনেমা দেখার কথা ভাবেন।
হঠাৎ করে কোনো কোনো সিনেমা দর্শক পেলে তাকে মৌসুমি হাওয়া বলাই সংগত। সুদিন বলা হলে বুঝি বাড়িয়ে বলা হয়। যখন কেউ বলে চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে এসেছে, তখন শহুরে শিক্ষিত মানুষের কথা মাথায় রেখেই বলে। মফস্বল শহরের বিনোদনের পরিবেশকে যে ইতিমধ্যেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, সে কথা মনে রাখা হয় না।
রুচিশীল প্রযোজকের অভাব, গ্রামগঞ্জে বিনোদনের ব্যবস্থা সংকুচিত করে ফেলা, যাত্রা, বাউলগানের ওপর সরাসরি আঘাত, স্কুল-কলেজ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য খর্ব করা, সরকারের সঙ্গে সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বদের আঁতাত, কালোটাকার মালিকের হাতে সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া, কেব্ল টেলিভিশনে পুরো সিনেমা দেখার সুযোগ পাওয়া, এমনকি নিজের মোবাইল ফোনকেই বিনোদনের প্রধান মাধ্যম করে তোলা—ইত্যাকার কত ঘটনাই তো রয়েছে, যা মানুষকে হলবিমুখ করেছে। এই সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরানোর ভাবনাকে অলীক ভাবনাই বলা যায়। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে একসঙ্গে অনেকগুলো মেধাবী মুখ দেখা যাচ্ছে অনেক দিন পর, এই ইতিবাচক সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। তাঁদের হাত ধরে চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসার শুরু হতে পারে।
তিন.
আমাদের মঞ্চনাটককে মুক্তিযুদ্ধের ফসল বলা হয়ে থাকে। আগেও নাটক ছিল, কিন্তু নিয়মিত দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর থেকেই। বৈচিত্র্যময় দেশি-বিদেশি নাটক উপহার দিয়েছে আমাদের মঞ্চ। নাটক ছড়িয়ে গেছে গোটা দেশে। কিন্তু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, চলচ্চিত্রে যেভাবে অর্থের লগ্নি হয়, নাটকে সেভাবে হয় না; বরং সাহস করে বলাই যায়, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর হিম্মত আছে যাঁর, তিনিই এখন পর্যন্ত মঞ্চনাটক করে যাচ্ছেন।
মঞ্চনাটক নিয়ে কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবেই গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন নিয়ে কথা বলতে হয়। কিছুদিন আগে ফেডারেশনে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। কোনো রকম কারণ দর্শানোর ব্যবস্থা না রেখেই তাঁদের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং ফেডারেশনের সভাপতি এখন লিয়াকত আলী লাকী, দুটো পদ পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ফেডারেশনের কাজ এগোচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, ফেডারেশনে নির্বাচনী ব্যবস্থা কায়েম করার পর থেকেই নাটকের দিকে মন না দিয়ে অনেকেই নেতা হওয়ার বাসনায় নির্বাচনমুখী হয়েছেন। নানা প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায়ের কারবারও শুরু হয়ে গেছে। এটা নাটকের মসৃণ চলার পথকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেউ কেউ বলছেন, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ যখন ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন, তখন থেকেই শুরু হয়েছে এই স্থবিরতা।
যে ১১টি লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলার কথা ছিল ফেডারেশনের, তার অনেকগুলো নিয়ে একেবারেই কোনো কাজ করা হয়নি। এ রকম দায়সারা ফেডারেশনকে দিয়ে নাটকপাড়ার কী লাভ—এ প্রশ্নও করছেন অনেকে।আসলে মঞ্চনাটক এখন যে সংকটে পড়েছে, তা গভীর। ভালো মানের প্রযোজনা নাকি নাটকের নিয়ন্ত্রক তথা নেতা হয়ে ছড়ি ঘোরানো—এই অবস্থা বজায় থাকলে সামনে অশনিসংকেতই দেখা যাবে।
চার.
রাজনীতি আর সংস্কৃতি পাশাপাশি না চললে রাজনীতির মেঠো স্লোগান জনরুচিকে ধাক্কা দিতে পারে। মানুষের ভেতরের সুকুমারবৃত্তিগুলো তাতে নষ্ট হয়।
এ কথা তো ঠিক, একটা সময় ছিল, যখন যেকোনো শিল্পই ছিল মানুষের বোধগম্য। কিন্তু ধীরে ধীরে এমন একটা সময় এল, যখন শিল্পীর চেতনা আর জনগণের ভাবনার মধ্যে একটা দূরত্ব চলে এল। দেখা গেল, শিল্পী যা তৈরি করছেন, তার সূক্ষ্মতার নাগাল পাওয়া কঠিন। তৈরি হলো বিমূর্ত শিল্প। শিল্পের উৎকর্ষের সঙ্গে সাধারণ জনগণের যে ব্যবধান তৈরি হলো, তাতে নতুন শিল্পের সঙ্গ পাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার ব্যাপারটা বড় হয়ে দেখা দিল, অর্থাৎ শিল্প বুঝতে হলে তার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদ বলে এক সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতা এসেছিল একসময়। সে ছিল সৃজনশীল শিল্পের জন্য মরণকাল। কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে শিল্প সৃষ্টি হতো। জোর করে সর্বহারা মানুষের বিজয় দেখানো হতো সেখানে। শিল্পীরা পার্টির নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতেন। এটা যে শিল্প সৃষ্টির প্রধান অন্তরায়, সে কথা শুরুতে শিল্পীরা বুঝতেও পারতেন না। এখানে রাজনীতি-সংস্কৃতি একসঙ্গে চলছে না, রাজনীতি সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। নিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতির মানে হলো হাফ প্যান্টের বুকপকেট কিংবা ঘোড়ার ডিম। একটু ভিন্নভাবে একই প্রবণতার সৃষ্টি হয় যেকোনো প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানের চোখে যদি কোনো কিছু বিকৃত বলে মনে হয়, তাহলে তারা তার প্রচারের ব্যাপারে কঠোর হয়। যেমন বিশ্বভারতীর কোপানলে পড়েছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। কিন্তু এখানে মনে রাখা দরকার, দেবব্রত বিশ্বাস সুর বিকৃত করে কিংবা গানের কথার প্রতি বিশ্বস্ত না থেকে গান করেননি। বিশ্বভারতীর পান্ডাদের মনে হয়েছে, তিনি তাদের দেখানো পথে গাইছেন না। ওটাই তাঁর দোষ। এখন তো দেখা যাচ্ছে, দেবব্রত বিশ্বাসের শক্তিশালী কণ্ঠই রবীন্দ্রসংগীতপ্রেমীদের বেশি পছন্দ।
এর বিপরীতে আছে সৃজনশীলতার নামে যা ইচ্ছে তা করার প্রবণতা। কোনো রকম পরিশ্রম, মেধা, চর্চার বদলে নিজের ইচ্ছেমতো কনটেন্ট তৈরি করে সাধারণ মানুষের বিনোদনের ব্যবস্থা করা। সে কাজে কতটা সৃজনশীলতা, রুচিবোধ রয়েছে, তার তোয়াক্কা না করা। হিরো আলম সেই গোত্রের মানুষ।
হিরো আলমের কাজ নিয়ে নাগরিক মনে প্রশ্ন জাগে। অনেকেই তাঁর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আঁচ পাওয়া যায়। কিন্তু ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে একটা শ্রেণির কাছে তো তিনি মহানায়ক হয়ে উঠেছেন। টিকটকে স্থূলতার চাষবাস করেও অনেকে জনরুচিতে প্রভাব (শুভ না অশুভ, সে বিতর্কে যাব না) রাখছেন।
হিরো আলমকে নিয়ে সমালোচনামুখর হওয়া যায়, কারণ তাঁর কোনো শক্ত খুঁটি নেই। একই রুচির মানুষের হাতে টাকা থাকলে তাঁরাও যে পরিশ্রম, মেধা ও চর্চা ছাড়াই গান গাইতে পারেন, সিনেমায় অভিনয় করতে পারেন, সেটাও আমরা দেখেছি। এখানে শিল্পবোধের নিরিখে প্রশ্ন তোলাই যায়, তাঁরা কি জনরুচি গড়ছেন, নাকি নষ্ট করছেন?
এই প্রশ্নের নানা রকম উত্তর রয়েছে। তবে, গানের সঙ্গে যদি সুর ও কথার যোগাযোগ থাকে এবং এ দুটোকেই বিকৃত করা হয়, তাহলে কারও সংগীত প্রচেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অসংগত নয়। ‘আমার পরান যাহা চায়...’ গানটি হিরো আলম গেয়েছেন বিকৃত সুরে এবং গানের কথা বদলে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের তৈরি শব্দমালা দিয়ে। রবীন্দ্রসংগীতের কপিরাইট বিশ্বভারতীর নেই বলে কথা আর সুরকে অগ্রাহ্য করতে হবে, তা তো নয়। তাহলে তো রবীন্দ্রবিরোধিতার কালে ‘হাই সংগীত’ই হয়ে উঠত রবীন্দ্রসংগীত।
পাশাপাশি আরেকটি কথাও বলতে হবে। বর্তমান যুগে হাতে একখানা মোবাইল ফোন থাকলেই যে কেউ যেকোনো কনটেন্ট তৈরি করে অন্তর্জালে ছড়িয়ে দিতে পারেন। কোনো দিন রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলগীতি গাইতে পারবেন না, এমন কোনো মুচলেকা যদি হিরো আলমকে দিতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পুলিশি নজরদারি শুরু হয়েছে। এটা একটা ভয়ানক পথ। পুলিশের রুচি দিয়ে সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা সংস্কৃতির বিকাশকেই আড়ষ্ট করে দেবে। এখন তো হিরো আলমের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, সেটা যেকোনো সময় ‘সুশীল, বনেদি’ সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের সাংস্কৃতিক মর্যাদাও হরণ করে নিতে পারে।হিরো আলম বা তাঁদের মতো মানুষদের ব্যাপারে একটাই কথা, যদি তাঁদের তৈরি কনটেন্ট দেখার বা শোনার ইচ্ছে থাকে, শুনবেন। শোনার ইচ্ছে না থাকলে অগ্রাহ্য করবেন। এটাই এখন নিজের রুচিকে বাঁচিয়ে রাখার তরিকা।

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি খুব পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত ব্যবহার করতেন। সুগন্ধির প্রতি প্রিয় নবী (সা.)-এর বিশেষ অনুরাগ ছিল। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘চারটি বস্তু সব নবীর সুন্নত—আতর, বিয়ে, মেসওয়াক ও লজ্জাস্থান আবৃত রাখা।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২২৪৭৮)
০৭ মার্চ ২০২৬
গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে সর্বশেষ (৫৪ তম) সাক্ষীর জেরা শুরু হয়েছে। এই মামলাটির বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ।
০৬ অক্টোবর ২০২৫
‘দুই দিন আগেই বাড়ি থেকে পাথরঘাটায় চলে এসেছি। এখন পুরোনো জাল সেলাই করছি। এক সপ্তাহের বাজারও করে এনেছি। আজ বিকেলে সাগর মোহনায় যাব, গভীর রাত থেকে জাল ফেলব।’ কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদরের বাইনচটকী এলাকার জেলে হোসেন আলী। গতকাল বুধবার সকালে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কথা হয় তাঁর...
১২ জুন ২০২৫
ভারতের স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞার পর সীমান্তে আটকে থাকা তৈরি পোশাক, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকগুলো ফেরত আনছেন রপ্তানিকারকেরা। তবে যেসব ট্রাক বন্দরে ঢুকে গিয়েছিল, সেগুলো ভারতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ট্রাক ঢুকতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।
১৯ মে ২০২৫