Ajker Patrika

অসীম প্রেরণার অনন্য উৎস ইলা মিত্র

তাপস মজুমদার
অসীম প্রেরণার অনন্য উৎস ইলা মিত্র

বিপ্লবী ইলা মিত্র। তেভাগা আন্দোলনের উজ্জ্বল একটি নাম। খেলাধুলায়ও নাম করেছিলেন। ১৯৪০ সালের অলিম্পিকে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সালে কলকাতা থেকে বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রামচন্দ্রপুরে এসেছিলেন বৈবাহিক সূত্রে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভেবেছিল তাদের অভাব শেষ হবে, তাদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের অবসান হবে। কিন্তু তা হলো না। তাই মানুষ তার অধিকার আদায়ের লড়াই থামাতে পারল না। সাধারণ মানুষ বা কৃষক এটা শুরু করেছিল মূলত বাঁচার তাগিদে। ১৯৪৬-৪৭ সালে তেভাগা আন্দোলন দেশের অন্যান্য স্থানে উচ্চ মাত্রা পেয়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে সেটা তুঙ্গে ওঠে ১৯৫০-এ, ইলা মিত্রের নেতৃত্বে।

তেভাগা অর্থ হচ্ছে তিন ভাগ। কৃষকদের দাবি ছিল, ফসল ফলিয়ে দুই ভাগ নিজেরা রাখবেন, এক ভাগ জমিদার বা জোতদারদের দেবেন। তা ছাড়া, মাড়াই করে বিশ আড়ি ফসল হলে তিন আড়ি কৃষকেরা পেতেন। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যই ছিল ‘সাত আড়ি জিন ও ফসলের তেভাগা’।

ইলা মিত্র কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৪২ সালে। জোতদার স্বামী রমেণ মিত্রের বাড়িতে মেয়েদের ঘরের ভেতরে থাকার চল ছিল। ইলা মিত্র এ নিয়ম ভাঙলেন। রামচন্দ্রপুরের পাশেই কৃষ্ণগোবিন্দপুরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর বাইরে আসা শুরু হলো।

নাচোলে পিছিয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা ছিল বেশি; বিশেষ করে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর। নাচোলসহ নবাবগঞ্জের হাজার হাজার শিশু অপুষ্ট, ক্ষুধার্ত, শীর্ণ, মৃতপ্রায়। এই অবস্থা ইলা মিত্রকে ব্যথিত করে। কৃষকেরা জমিদারের অধীনে কাজ করে অভ্যস্ত। সুতরাং তাঁদের বিরুদ্ধে কৃষকেরা কথা বলবেন, এটা প্রায় অকল্পনীয়। ইলা মিত্র সেখান থেকে জনতাকে জাগ্রত করেন। এখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য। রমেণ মিত্রের প্রায় ৫০০ বিঘা জমি ছিল। তিনিই প্রথম তেভাগার প্রচলন শুরু করেন। তখন ইলা মিত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়ে যায়। এই আস্থা ও ভালোবাসার ধারাবাহিকতায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘রানিমা’।

পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধঘোষিত হওয়ায় ইলা মিত্র ও তাঁর স্বামী দুজনই আত্মগোপনে চলে যান। বড় জোতদার ঘরের বউ হয়ে তাঁর কোনো প্রয়োজন ছিল না নিঃস্ব মানুষের কাতারে গিয়ে নিজের শ্রেণির বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ ঘোষণা করার। করেছেন শুধু একটি সুস্থ ও সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের আশায়। আগের তেভাগা আন্দোলনে (১৯৪৬-৪৭) নারীর অংশগ্রহণ ততটা ছিল না, যতটা নাচোলে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে হয়েছিল।

আন্দোলনের ফলে জমির ফসল ফলিয়ে কৃষকেরা দুই ভাগ নিজেরা রেখে এক ভাগ জোতদার বা জমিদারদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে থাকেন। সাঁওতাল, হিন্দু, মুসলমান কৃষকদের প্রাণপণ ঐক্যবদ্ধতার কারণে জোতদারেরা অসহায় হয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি পুলিশ-জোতদারের যৌথ প্রয়াসে গ্রামে গ্রামে পুলিশি অভিযান চলে। কিন্তু পুলিশের ওপর জনতা এতটাই ক্ষিপ্ত ছিল যে তারা চারজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে।

এর পরিণতিতে এলাকায় ব্যাপক নির্যাতন নেমে আসে। গ্রেপ্তার হন ইলা মিত্রসহ অসংখ্য কৃষক নেতা-কর্মী। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অনেক গ্রাম। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয় অসংখ্য কৃষককে। অজস্র নারী ধর্ষিত হন। বর্বর নারকীয় অত্যাচার চলে ইলা মিত্রের ওপর, যাতে মানবসভ্যতা লজ্জিত হয়, শিউরে ওঠে প্রকৃতি। প্রথমে নাচোল থানা, এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, তারপর রাজশাহী কারাগারে এক বছর নির্জন অন্ধকারে বন্দী থাকার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিচারে ইলা মিত্রসহ নাচোল আন্দোলনের তথাকথিত আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে হাইকোর্ট পুনর্বিচারের নির্দেশ দেন। পুনর্বিচারে যথেষ্ট সাক্ষী না পাওয়ায় ইলা মিত্রসহ অন্যদের সাজা কমিয়ে ১০ বছর করা হয়।

পরে ১৯৫৪ সালে তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। ইলা মিত্রের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হরেককে প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখে বলতে বলা হয়, ইলা মিত্রের নির্দেশেই পুলিশ হত্যা সংঘটিত হয়েছে। হরেক মুখ খোলেননি; বরং জীবন বিসর্জন দিলেন। তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার আরও কয়েকজনকে রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল এবং ইলা মিত্রের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাম্প্রদায়িক উসকানিও দিয়েছিল।

এই কাহিনি যেমন বীরগাথা, তেমনি মর্মান্তিক। আজন্ম সংগ্রামী ইতিহাসের বীর ইলা মিত্র মুক্তিকামী বাঙালির অসীম প্রেরণার অনন্য উৎস। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই মহীয়সীর জন্মদিনে অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।

লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও ইলা মিত্র শিল্পী সংঘের সভাপতি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১৬ মাসের শিশুকে সেতু থেকে নদীতে ছুড়ে ফেলে থানায় গেলেন মা

ইরানকে আরেকটি সুযোগ দিতে ট্রাম্পকে শেষ মুহূর্তে রাজি করায় সৌদি, কাতার ও ওমান

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা স্থগিতের আওতায় কারা পড়বে না, জানাল স্টেট ডিপার্টমেন্ট

তালেবানের শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষমতার সংঘাত—বেরিয়ে এল বিবিসির অনুসন্ধানে

জামায়াত লড়বে ১৭৯ আসনে, জোটের সমঝোতা ২৫৩টিতে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত