Ajker Patrika

কী করি, কী পরি…

আশান উজ জামান
কী করি, কী পরি…

নারীরা যে হাইহিল জুতা পরেন, আসলে তা তৈরি করা হয়েছিল পুরুষের জন্য। ঘোড়ার পিঠে উঠতে-নামতে সুবিধা দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য। ষোলো শতকের দিকে ফরাসিদের কাছ থেকে এর ব্যবহার পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় এটা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও গণ্য হতো। যেহেতু উঁচু হিলযুক্ত জুতা পরে চলাফেরা বা কাজ করা কঠিন, তার মানে তারাই এটা পরতে পারে, যাদের এসব দৈনন্দিন সাধারণ কাজ করা লাগে না, অর্থাৎ তারা নিশ্চয়ই অভিজাত ঘরের মানুষ! এ রকম চিন্তা থেকেই ফ্যাশন হিসেবে পরে সেটা নারী জাতির পায়ে উঠেছে, যেমন উঠেছে লেগিংস। আজকের দিনে হয়তো কোনো পুরুষকেই লেগিংস পরিহিত অবস্থায় দেখা যাবে না, কিন্তু মধ্যযুগের স্কটল্যান্ডে এটার উৎপত্তি হয়েছিল পুরুষের পোশাক হিসেবেই এবং উদ্দেশ্য ছিল অত্যধিক ঠান্ডা থেকে পা জোড়া বাঁচানো। ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্যই মানুষ প্রথম দুই পায়ে কাপড় পেঁচিয়ে বের হতে শুরু করে, যুগে যুগে বিবর্তিত হয়ে যা আজকের প্যান্ট-ট্রাউজার্সে রূপ নিয়েছে।

এভাবে আমরা যদি আমাদের পোশাক ও অন্যান্য পরিধেয় বস্তুর ইতিহাস ঘাঁটি, দেখা যাবে সবগুলোই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য পালনের জন্য এসেছে, যার অধিকাংশই প্রাকৃতিক নানান পরিস্থিতিপ্রসূত। যদিও বলা হয় লজ্জা সংবরণের জন্যই গুহাবাসী আড়াল নিতে শুরু করে, তবে আমার বিশ্বাস কথাটা ঠিক না। আধুনিক বিশ্বে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রাগৈতিহাসিক জীবনের মান বিচার করার কারণেই ভুলটা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা তখনকার জীবনধারার যত নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন, তা দেখে বরং বলা চলে প্রাকৃতিক নানা অবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতেই পোশাকধারার শুরু। যেমন মাথা ঢাকার প্রচলন হয়েছে সেই ২০ থেকে ২৫ হাজার বছর আগে। তখন নিশ্চয়ই চুল দেখানো যাবে না—এমন নিয়ম ছিল না, ছিল ঠান্ডা থেকে বাঁচার প্রয়োজন। প্রয়োজনেই গাছের পাতা, ছালবাকল, পশু-প্রাণীর চামড়া এবং আরও পরে নানা প্রকারের প্রাকৃতিক আঁশে বোনা পরিধেয় ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছে মানুষ, শরীরকে অপ্রকাশ্য ভাবার প্রবণতা এসেছে সেই অভ্যাসের ফলেই।

মানুষের খাদ্যাভ্যাস যেমন ভৌগোলিক পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, পোশাকও ঠিক তাই। যেখানকার যে প্রাকৃতিক পরিবেশ, তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য কাছেপিঠে যা পাওয়া গেছে, তা দিয়েই মানুষ কাজ চালিয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলের আবহাওয়া, সংস্কৃতি ও সমাজবাস্তবতায় গড়ে উঠেছে তাঁতশিল্প। তাঁতে বোনা ধুতি-শাড়ি পরে কাটিয়েছে আমাদের পূর্বজ জনগোষ্ঠী। অন্যান্য দেশে আবার তাদের উপযোগী উপায়ে তৈরি হয়েছে পরিধেয়, গড়ে উঠেছে তাদের পোশাকের পদ্ধতি। শীতপ্রধান দেশের মানুষ তাই যে ধর্মেরই হোক, আঙুল থেকে শুরু করে মাথা, শরীরের প্রতিটি অংশ ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। আবার সেই তারাই গ্রীষ্মের তাপে বের হওয়ার সময় পরে নেয় ছোট পোশাক, স্বস্তির জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় মরু অঞ্চলের বাতাসে জলীয়বাষ্প কম, বিশ্রীরকম ঘাম হয় না; একই সঙ্গে সেখানে সূর্যের তাপও এত তীব্র যে শুনেছি শরীরের খোলা অংশ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়। স্বাভাবিকভাবেই তারা সর্বশরীর ঢেকে বের হয়। কিন্তু আমাদের মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে যেখানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি বেশি আর ভ্যাপসা গরমে ঘরে বসেও ঘামে ভিজে যেতে পারে দেহ, সূর্যের আলো গায়ে পড়লেও তেমন ক্ষতি হয় না, সেখানেও কেন ওই পশ্চিমা বা মধ্যপ্রাচ্যীয় পোশাক পদ্ধতি গ্রহণ করবে মানুষ?

আশান উজ জামানযদিও ঔপনিবেশিক মানসিকতা আর অন্ধ অনুকরণের দোষে আমরা তা করেই বসে আছি। একবার ভেবেও দেখিনি যে তীব্র শীত বা গরমের কারণে তাদের কাছে যা স্বাভাবিক ও আরামদায়ক, আমাদের আবহাওয়ায় তা-ই প্রচণ্ড বেমানান ও অস্বস্তির। ফলে চৈত্রের দাবদাহের মধ্যে কিংবা ভাদ্রের কাঁঠালপাকা গরমেও আমাদের এক্সিকিউটিভরা স্যুট-টাই পরে অফিস করেন; আর তাঁদের কম্ফোর্টের জন্য কাচঘেরা অফিসে কৃত্রিম ইউরোপীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা লাগে। বিনীত একটু দ্বিমত রেখে যাই তাঁদের জন্যও, যাঁরা মনে করেন পোশাক ব্যাপারটা ধর্মীয়। ইতিহাস বলে, ধর্মের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই মানুষ নিজ নিজ সময় ও পরিবেশের উপযুক্ত পোশাক পরে আসছে। সেই সবের মধ্যে থেকেই একেক ধর্ম তার প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করেছে। আবার প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরাই মনে করেন তাঁদের ধর্মীয় বিধান সর্বজনীন, তাই তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পোশাকের বেলায় এই সর্বজনীনতা খাটে না, ভীষণভাবে তা পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রয়োজন আর প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, পোশাক যতটা না ধর্মীয়, তার চেয়েও বেশি মানুষের নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক অনুষঙ্গ, যার রকমফের হয় ভৌগোলিক অবস্থানভেদে। আর এখানেই আসে প্রাপ্যতার প্রশ্ন। আদি যুগে মানুষ নিজের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকত, ফলে নিজেদের পোশাকই পরতে হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যের প্রসার আর প্রযুক্তির উৎকর্ষের জোরে এখন সবখানেই সবকিছু পাওয়া যায়। তাই বলে কি আমরা গরমে কাশ্মীরি শাল পরে ঘুরব বা শীতকালে শর্টস আর হাওয়াই শার্ট? নিশ্চয়ই না। যত যা-ই হোক, প্রয়োজন ও রুচির সঙ্গে সংগতি রেখেই পোশাক পরবে মানুষ।

যিনি কোথাও আজ মিনি স্কার্ট পরে হাঁটছেন, বরফের দেশে তিনিই দু-তিন পরতের পোশাকের ওপর পুলওভার চাপিয়ে সবকিছু ঢেকেঢুকে রাখবেন। এখানে জোরজবরদস্তি বা নিয়ম করে দেওয়ার সুযোগ কি আসলেই আছে? একটা ব্যাপার মনে রাখলেই হয়, মানুষের প্রয়োজনেই পোশাক, পোশাকের প্রয়োজনে মানুষ নয়। ফুটবল খেলার প্রয়োজনে আমরা তাই শর্টস পরব, ক্রিকেটের সময় লম্বা ট্রাউজার্স; অফিসে ও কলকারখানায় যাওয়ার সময় যেমন রুচি ও সামর্থ্যের উপযুক্ত পোশাক পরার চেষ্টা করব, তেমনই আবার ঘরে থাকার সময় নজর থাকবে আরামের দিকে। পছন্দ বলে কেউ যেমন পাজামা-পাঞ্জাবি বা বোরকা-হিজাব পরতে পারে, বাঙালি হিসেবে আমি তেমন ধুতি-জামাও পরতে পারি, এখানে অন্যরা কেন ঠিক করে দিতে চাইবে তুমি এই পোশাক পরো, এই পোশাক পোরো না? 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত