Ajker Patrika

হিসাবের পাওনা চাই জাতিসংঘ

হিলাল ফয়েজী
হিসাবের পাওনা চাই জাতিসংঘ

লন্ডন থেকে কামাল আহমেদ একটি দৈনিককে জানিয়েছেন, গুম নিয়ে স্বাধীন তদন্তের বিষয়টি আবার এল জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৫১তম অধিবেশনে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নাদা আল নাশিফ গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন বলে কামাল আহমেদের প্রতিবেদনে জানানো হয়। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের মান উন্নয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ব্রতী সংগঠন জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ খুবই অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ।

কামাল আহমেদ আন্তর্জাতিক মাপ ও মানের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদক-সাংবাদিক। তবে এই ৫১তম অধিবেশনের ৩ নম্বর অ্যাজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যময় এবং মহা মানবিক ইস্যুটি তিনি কেমন করে এড়িয়ে গেলেন বোঝা গেল না।

ইতিহাস সচেতন পাঠকমাত্রই জানেন নিদেনপক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বৃহৎ আকারের নিষ্ঠুর নৃশংস জেনোসাউড তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাটি আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে অত্যন্ত সুনিপুণ পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে। সেই ভয়ংকর স্মৃতি বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে, যা আজও বহন করে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

১৯৭১ সালের সেই পৃথিবী শিহরিত করে দেওয়া বাংলাদেশ জেনোসাইড ইস্যুটি ৫১ বছর পর আজও জাতিসংঘের ফোরামে আলোচিত হতে পারেনি। কেবল প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানি সেনা খুনিরা ওই জেনোসাইডের জন্য দায়ী হলেও কান টানলে মাথা আসের মতো করে চলে আসে নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্র। অতএব গুম হয়ে গেল খোদ ‘বাংলাদেশ জেনোসাইড ১৯৭১’ ইস্যুটি। আমাদের জ্ঞানী-গুণী সুশীল মানবাধিকার মহল এমনি গুমকে তেমন আমলে নেয় বলে মনে হয় না।

কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের তদানীন্তন প্রধান ব্যাসেলেট বাংলাদেশ ঘুরে তন্ন তন্ন করে 
খুঁজলেন হাল আমলের মানবাধিকার তথা গুমবিষয়ক ঘটনাবলি। আমাদের একঝাঁক মানবাধিকার পাখি কোথা থেকে এসে উড়াল দিয়ে চিঁ চিঁ চিঁ করে উঠলেন।

না, ওনারা অন্যায় করেননি। ভুল করেননি। হিটলার-ট্রুম্যান-স্তালিন যে সরকারই হোক মানবাধিকার খর্ব বা বিপন্নের অপরাধ লঘু করার কোনো যুক্তি বা কারণ নেই। যুদ্ধের সময়ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি।
কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইউক্রেনের মানবাধিকার লঙ্ঘিত ‘বুচা’ এলাকা স্বচক্ষে দেখেছেন। তিনি জানতেন কি 
না, কিংবা এখনো জানেন কি না যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি খুনিরা কাদের মদদে বাংলাদেশে ‘বুচা’র মতো শত শত নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে।

ব্যাসেলেট গেছেন। নাদা আল নাশিফ এসেছেন। জুলাইয়ের ৫০তম মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনের পর এবার ৫১তম অধিবেশন ১১ সেপ্টেম্বর শুরু হলো। ৫০তম সভার ৩ নম্বর অ্যাজেন্ডায় নেদারল্যান্ডসে কর্মরত কয়েকজন দেশপ্রাণ বাঙালি কোনোক্রমে আলোচ্যসূচিতে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের জেনোসাইড ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। BASUG (বিএএসইউজি) নামের এই বাঙালি জোট। তখন বাংলাদেশ থেকে আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, খুলনা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ অনেকে মিলেও সময়ের স্বল্পতায় ৫০তম অধিবেশনে ১৯৭১ সালে সংঘটিত বাংলাদেশের জেনোসাইড ইস্যুটিকে আলোচনায় আনতে পারিনি। আমাদের উদ্যোগের কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বীভৎস জেনোসাইড প্রান্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এবারের ৫১তম অধিবেশনেও সেই বিএএসইউজির সঙ্গে এক হয়ে ‘আমরা একাত্তর’ ও ‘প্রজন্ম একাত্তর’ ৩ নম্বর আলোচ্যসূচিতে ‘বাংলাদেশের একাত্তর জেনোসাইড’ অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।

আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক সংবাদ, বিএএসইউজির উদ্যোগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ আগামী ৩ অক্টোবর এক ঘণ্টার জন্য জেনেভায় জাতিসংঘের একটি হল বরাদ্দ করেছে এ বিষয়সংশ্লিষ্ট আলোচনার জন্য। আসুন, দেশে-বিদেশে একাত্তরের বাংলাদেশের জেনোসাইড ইস্যুটিকে নানা তৎপরতায় ভাস্বর করে তুলি। বাংলাদেশে ‘আমরা একাত্তর’-এর পক্ষ থেকে শতাধিক মানববন্ধন এবং বিশ্বজুড়ে কমপক্ষে আরও ১০টি মানববন্ধনের আয়োজন হয়েছে। আসুন, মানবাধিকারের সপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ অনুকূল সবাই এবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার হই জেনোসাইডের স্বীকৃতি আদায়ের সংগ্রামে।

হাল আমলের গুম-মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তো সংগ্রাম চলবেই। আবারও সবাইকে আহ্বান করছি, আসুন, একাত্তরের অসম্পূর্ণ কর্তব্য সম্পাদনে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। হিসাবের পাওনা জাতিসংঘকে চুকানোর পক্ষে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশিরা এক হই। একাত্তর যদি ভুলে যাই, তাহলে মানবাধিকারের 
কীই-বা অবশিষ্ট থাকে?

লেখক: প্রকৌশলী ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত