Ajker Patrika

স্বাধীনতার পঁচাত্তর: কী চেয়েছিলাম, কী পেলাম

গৌতম রায়
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২২, ১০: ৪৭
স্বাধীনতার পঁচাত্তর: কী চেয়েছিলাম, কী পেলাম

দ্বিজাতিতত্ত্বের ছুরির আঘাতে বাঙালি দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার পর ঠিক ৭৫ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেকেই হয়তো খুব আন্তরিকভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন; সাম্প্রদায়িকতা রুখবই। আর ৭৫ বছর পর, তাঁরা যদি জীবিত থাকতেন, সাম্প্রদায়িকতার বিষে নীল ভারতকে দেখে আঁতকে উঠতেন। হয়তো কবির কণ্ঠে গলা মিলিয়ে তাঁরা বলে উঠতেন, ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।’

আমরা যাঁরা ষাটের কোঠার দিকে বয়স বা জীবনকে ইতিমধ্যেই ঠেলে এনেছি, আমরা চিনতে পারি না আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবনে দেখা স্বদেশকে। যথার্থই আজ সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে না-পারা জনককে আমরা দেখি ফুটপাতের চিৎকৃত সর্পিল গতির মধ্যে। এক বীভৎস ভারত। এক নারকীয় ভারত। যে ভারতে আজ রফিক আজাদ ধার করে বুভুক্ষু সন্তানও বলতে ভুলে গেছে; ‘ভাত যে হারামজাদা’। এই ভারত আজ মৃত সন্তানের পাকস্থলী খুঁড়ে দেখে, সন্তানের ধর্ম কী।

দেশভাগের কালো দিনগুলো অতিক্রম করার পর অনেকেই হয়তো মনে মনে প্রার্থনা করেছিলেন; আগামী প্রজন্মকে যেন কখনো না দেখতে হয় সাম্প্রদায়িকতায় আকীর্ণ এমনতরো দিনগুলোকে। পূর্বপুরুষদের সেই প্রার্থনায় হয়তো ‘ভাগ্যদেবী’ নামক কল্পবাস্তবের পরাবাস্তবতা মুখ টিপে হেসেছিলেন। হিন্দুর দেশত্যাগ ঘিরে আমরা বড্ড বেশি রকমের উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম সেদিন। আর বড্ড বেশি রকমই উদাসীন থেকে গিয়েছিলাম, মুসলমানের দেশত্যাগ ঘিরে। মুসলমানের যন্ত্রণাও যে যন্ত্রণা, মুসলমানের চোখের পানিও চোখ থেকে বের হতে সেই মানুষটির বুক নিংড়ে উৎসারিত হতে হয়—এই বাস্তবতা বোঝার মতো মানুষ তখন এপার বাংলায় অন্নদাশঙ্কর রায় ছাড়া আর কজন ছিলেন? খণ্ডিত বাংলায় কখনো ফিরে যাননি ‘শাশ্বত বাংলা’র স্রষ্টা মনীষী কাজী আবদুল ওদুদ। আমরা পেরেছি তাঁর চেতনার একবিন্দু মর্যাদা রক্ষা করতে? ভাবতে পারা যায়, বেগম রোকেয়ার নামে আজ কলকাতা শহরে একটা রাস্তার নাম পর্যন্ত নেই?

 এই সব পথ পেরিয়েই কিন্তু আমরা এসেছি। আর এসেছি বলেই হয়তো এত সহজে সাম্প্রদায়িক জন্তুদের এই অবাধ মৃগয়াভূমি আমরা ছেড়ে দিতে পেরেছি। তাই আজ বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনে তাঁর পৈতৃক বাসভবনে অতিথি, বিশ্ববিশ্রুত লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর ওপর সঞ্চালক হুলিয়া জারি করেন, ‘বঙ্কিম আদৌ মুসলমানবিরোধী ছিলেন না, সেটাই আপনি তুলে ধরুন।’ সঞ্চালকের এই হিন্দু সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষাকারী আস্ফালনের প্রতিবাদ জানালে কলমচির প্রবেশ বঙ্কিমভবনে নিষিদ্ধ করেন ছোট শাসকের কৃপায় সেখানকার হত্তাকত্তা হয়ে বসা চিরজীবনে গোটা তিনেক সাকল্যে নোট বই লেখা এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। অথচ তাঁকেই এই কদিন আগে বড় শাসকের ছোট শাসকে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডাকে কোলগেটের বিজ্ঞাপনকে হার মানানো হাসি হেসে স্বাগত জানাতে দেখা যায়।

গোড়ায় গলদ ছিল? নাকি গোড়ার তৎপরতা সময়ের চাকা যত এগিয়েছে, ততই শ্লথ হতে শুরু করেছিল? ফলে জমতে শুরু করেছিল ‘গলদ’? মানুষের রুটি-রুজি, স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতোই দৈনন্দিন লড়াইয়ের একটা অংশ হওয়া দরকার ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে সীমাবদ্ধ করে রাখার মতো বিষয় ছিল না। সেই সংগ্রামে জয়ী হওয়া তো অনেক বড় কথা, সংগ্রামকে একটু পা চালিয়ে নেওয়ার জন্য দরকার ছিল সামাজিক আলোড়ন, আন্দোলন তো তারপরে—সেসব পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা না করার খেসারত এখন প্রতি পদে পদে আমাদের দিতে হচ্ছে।

গৌতম রায়অনেকেই বলেন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ফলে রাজনৈতিক বহু চাপান-উতোর সত্ত্বেও সে দেশের সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘুর ভেতরে সামাজিক অপরিচয় তেমন একটা নেই। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের আগেও, সেই মহান ভাষা আন্দোলনের কাল থেকে সংস্কৃতির প্রশ্নে সে দেশে বাঙালি যেমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে, সামাজিক ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে, তেমন কোনো বড় সাংস্কৃতিক লড়াই-ই এপার বাংলার বাঙালি লড়েনি। ফলে বামপন্থীরাও একদিকে ছিন্নমূল মানুষদের রুটি-রুজির লড়াইয়ে ব্যস্ত থেকে এদিকে নজর দেওয়ার তেমন সুযোগই পাননি যে এই ছিন্নমূল হিন্দুসমাজের সিংহভাগই এপার বাংলার বুকে মুসলমান-বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। তারই সুযোগ আজ একসঙ্গে নিচ্ছে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক শক্তি।

শ্যামাপ্রসাদ, নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা যে পর্যায়ের সাম্প্রদায়িকতার বিষে বাংলাকে জর্জরিত করতে পেরেছিলেন, তাঁদের উত্তরসূরি হরিপদ ভারতীদের সেই বিষপ্রয়োগ তত ফলপ্রসূ হয়নি বাম আন্দোলনের জনজাগরণের দৌলতে। তবু দেশভাগের অন্যতম কারিগর নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একদম ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সাম্প্রদায়িক শিবির থেকে বেরিয়ে আসার পর অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির তাঁকে মাথায় তুলে নাচা—এসব কি আজকের দিনের কোনো সূচনার পূর্বাভাস দিচ্ছিল না? নির্মলচন্দ্র যেহেতু সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পিতা, তাই দেশভাগের কালে ব্যাপক হারে দাঙ্গা লাগানোর নেপথ্য নায়ককে ঘিরে টিকিধারী বামুন, টুপিধারী মৌলভিরা মুখে কুলুপ এঁটে থাকতেই ভালোবাসেন!

একটা দীর্ঘ সময়জুড়ে ভারতীয় রাজনীতির মূলধারার মানুষ, যাঁরা কখনো সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না, তাঁরা নানা পর্যায়ে ভোট-রাজনীতির ফলাফলের নিরিখে প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন যে এ দেশ থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকেরা শেষ হয়ে গেছে। অথচ তাঁদের অনেকের হাতেই তখন শাসকের মানদণ্ড ছিল। ফলে ভারতে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর আদি গুরু আরএসএস ভারতব্যাপী কী কাণ্ড করে যাচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানে বিভাজন, বিভেদ সৃষ্টিতে কতখানি সক্রিয় এবং সহিংস ভূমিকা পালন করে চলেছে, সে খবর সেকালের শাসকের হাতে ছিল না—এটা ভাবলে ভুল হবে।

তাহলে সেকালের শাসক কেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর হলো না? তার কারণ হলো; ভারতে একমাত্র কমিউনিস্টরা ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলই নিজেদের স্বার্থে কখনো না কখনো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে আপস করে চলেছে। তবে ছয়ের দশকের শেষের দিকে পাঞ্জাবে গুরনাম সিং মন্ত্রিসভাকে একযোগে সমর্থন করেছিল সিপিআই এবং আরএসএসের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনসংঘ। সিপিআই তখন পুরোপুরিভাবে শ্রেণি সহযোগিতাবাদী রাজনীতি করছে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, পাঞ্জাবে তাঁদের সতপাল ডাং, বিমলা ডাংয়ের মতো জাতীয় আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করা ব্যক্তিত্বরা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও গান্ধীজিকে যে সংগঠনটি হত্যা করেছিল, সেই আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন জনসংঘের সঙ্গে সিপিআই সরকার পরিচালনা ঘিরে ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছিল।

বাংলার সংস্কৃতিতে সম্প্রীতির বৃক্ষ, তার শিকড় অনেক দূর বিস্তার ঘটাতে পেরেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে—এই আত্মতুষ্টিতে মত্ত থেকে আমরা একবারও ভাবার চেষ্টা করিনি যে সেই শিকড়কে ভেতর থেকে ফোপরা করে দেওয়ার জন্য উইপোকা কেমনভাবে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির মস্তিষ্কে বাসা বেঁধে আছে। আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষভাবে আরএসএসের সঙ্গে বোঝাপড়ার দিকগুলো যখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে আরও গভীরভাবে, তখন একটিবারের জন্যও আমরা চিন্তা করিনি, বিগত শতকের নয়ের দশকের শেষের দিকে, নিছক জ্যোতি বসুর প্রতি অসূয়াপ্রসূত মানসিকতা, নিছক ব্যক্তি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রতি অসূয়াপ্রসূত মানসিকতা থেকে আমরা আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির সঙ্গে মমতার যখন নির্বাচনী আঁতাত গড়ে উঠল, তখন তার সর্বাত্মক প্রতিবাদ করিনি।

প্রতিরোধের সর্বাত্মক সংকল্প করিনি। আমরা আসলে বিজেপির কর্মকাণ্ড নিয়ে যত বেশি সোচ্চার থেকেছি, তার এক কণা সময়, মেধা, রাজনৈতিক কার্যক্রম, সামাজিক কার্যক্রমকে পরিচালিত করিনি তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএসের কর্মধারা সম্পর্কে। আর সেই ছিদ্রপথেই কিন্তু আরএসএস সুচ হয়ে ঢুকেছে। এখন ফাল হয়ে নিজেদের পরিচয় রাখতে শুরু করেছে।

লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত