Ajker Patrika

বামপন্থী এবং সাম্প্রদায়িক শিবির

গৌতম রায়
বামপন্থী এবং সাম্প্রদায়িক শিবির

ত্রিপুরা বিধানসভার নির্বাচন পর্ব সবেমাত্র শেষ হয়েছে। আগামী ২ মার্চ ভোট গণনা। ওই দিন দুপুরের ভেতরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে, শাসক বিজেপি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারল, না বামেরা তাদের হৃত ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করল।

ত্রিপুরার ভোট ভারতের পূর্বাঞ্চলে আগামী লোকসভা ভোটের (২০২৪) আগে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির কাছে একটা অগ্নিপরীক্ষা। প্রশাসনিকভাবে বিজেপির ব্যর্থতা প্রায় সাড়ে নয় বছরে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে, সর্বত্রই বিজেপিকে বড় রকমের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়ার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদীদের তথাকথিত ডবল ইঞ্জিন তত্ত্ব ত্রিপুরায় কার্যকরী ছিল, অর্থাৎ দিল্লি এবং ত্রিপুরা—দুই জায়গাতেই একযোগে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি। ফলে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হওয়াকে ত্রিপুরায় শাসক বিজেপিকে একটু বেশি রকমই মোকাবিলা করতে হয়েছে।

শাসকবিরোধী হাওয়াটা ত্রিপুরায় বিগত বিধানসভার ভোটে জিতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকেই ক্রমেই জমাট বাঁধতে শুরু করেছিল। ক্রমে সেই শাসকবিরোধী মানসিকতা সেখানে এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজেপিকে সেই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী বদল পর্যন্ত করতে হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বদল করেও বিজেপি যে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে, এমনটা মনে হয় না। প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিজেপির সার্বিক ব্যর্থতাটাকে বিরোধী বামফ্রন্ট যেভাবে লড়াইয়ের ময়দানে টেনে আনতে সমর্থ হয়েছে, সেটা গোটা ভারতের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে পরাজিত হওয়ার পর বামপন্থীদের সেখানে জান কবুল লড়াইয়ের ময়দানে যেভাবে ২০২২ সালে সেলিম সিপিআই (এম) দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করার পরে অনেক বেশি কার্যকর দেখা যাচ্ছে, ত্রিপুরায় কিন্তু অবস্থাটা তেমন ছিল না। বিগত নির্বাচনে পরাজয়ের পর ত্রিপুরায় মানিক সরকারের নেতৃত্বে, সেখানকার বামপন্থী নেতারা কিন্তু মান-অভিমান বা পারস্পরিক দোষারোপ নিয়ে বসে থেকে শত্রু শিবিরকে সুবিধা করে দেননি। ক্ষমতা থেকে সরে আসার দিন থেকে বিরোধী দল হিসেবে ত্রিপুরায় সিপিআই (এম) যে ভূমিকা রেখেছে, তার ফলে বলতে পারা যায় যে বিজেপি যদি পুলিশ-প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে গতবারের মতো ইভিএম মেশিনে কারচুপি না করে, তাহলে ত্রিপুরায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে পরাজিত করে বামফ্রন্টের ক্ষমতায় ফিরে আসা, শুধু সময়ের অপেক্ষা। 

বামেরা যদি ত্রিপুরায় সত্যিই ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, তাহলে সেটা আগামী লোকসভা ভোটের আগে গোটা দেশেই ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কাছে বিরাট অক্সিজেন জোগাবে। তবে বামপন্থীদেরও মনে রাখা দরকার, ভারতজুড়েই বামপন্থী পরিমণ্ডলে এমন কিছু মানুষ কোনো না কোনোভাবে যুক্ত হচ্ছে, যাদের মূল উদ্দেশ্য বামপন্থী আবরণ বজায় রেখে হয় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে, নয়তো জাতিসত্তাকে, ভাষার প্রশ্নে একটা দ্বৈত চরিত্র পালন করে যেকোনো ধরনের বিভাজনকে তীব্র করে আসলে বামপন্থীদেরই দুর্বল করা। ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরকেই শক্তিহীন করা।

বিষয়টি বোঝাতে একটি কেস স্টাডি উপস্থাপন করছি। ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকাকালে সমরেশ বসুর শহর থেকে একটি ছেলে সেখানকার একটি কলেজে অধ্যাপনা করতে যায়। ছেলেটির পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ছাত্র থাকাকালীন বামপন্থী পরিমণ্ডলের সঙ্গে তাঁর একটা সখ্য ছিল। সেই সখ্যের ইতিহাস কাজে লাগিয়ে ছেলেটি ত্রিপুরার বেশ রিমোট অঞ্চলে চাকরি পেয়ে সেখানে সেই সময়ে ক্ষমতাসীন বামপন্থীদের অনেকের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে।

ছেলেটির ত্রিপুরার এক সহকর্মীর কাছে শুনি, ছেলেটি ক্রমেই জনজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে তাদের ওপরে বাঙালিদের নানা ধরনের অত্যাচারের মনগড়া অথচ রোমহর্ষক গল্প প্রায় গোয়েবলসের কায়দায় বলতে থাকে। ঠিক যে কাজটি আরএসএস তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে বামদের হটিয়ে ত্রিপুরায় ক্ষমতাসীন করার জন্য করতে শুরু করেছিল, সেই কাজটিই আমার পাশের শহরের ওই ছেলেটি ত্রিপুরায় অধ্যাপনা করতে গিয়ে, নিজে একটা বামপন্থী ভেক ধরে, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বামফ্রন্ট সরকারের থেকে নিয়ে অবাধে করে গিয়েছিল।

বামপন্থী শিবিরে, বামপন্থার ভেক নিয়ে, প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে, একটা বড় অংশের লোককে পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় আরএসএসের বিভাজনের রাজনীতিকে শক্তি জোগাতে কর্মরত, বামপন্থীরাও সেটা সব সময়ে ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারে না। তাদের এটা না বুঝতে পারার প্রধান কারণ হলো, হিন্দুত্ববাদীদের সার্বিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বামপন্থীদের সুনির্দিষ্ট কোনো রিসার্চ উইং নেই। হিন্দুত্ববাদীদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে কিন্তু বামপন্থীদের সম্পর্কে একদম পেশাদারভাবে গবেষণার কাজটি করা হয়।

যে অধ্যাপকের কথা দিয়ে আরএসএসের এই বামপন্থীদের ভেতরে চর ঢুকিয়ে দেওয়ার কথা বলছিলাম, ছেলেটি বর্তমানে ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর, সেই রাজ্য ছেড়ে চলে এসে পশ্চিমবঙ্গে একটি সরকারি কলেজে কর্মরত। তাঁর এক ঘনিষ্ঠ অধ্যাপক, পূর্বোক্ত অধ্যাপকের একাধিক লেখা থেকে আমাকে দেখিয়েছেন, জনজাতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে, জনজাতিকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিতে সেই অধ্যাপকের কলমের কেরামতি। অথচ পশ্চিমবঙ্গে সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের যে বামপন্থী প্রভাবিত সংগঠন রয়েছে, সেই সংগঠনে আরএসএসের গোপন গুপ্তচরটি অত্যন্ত সক্রিয়।

পশ্চিমবঙ্গে সরকারি কলেজে অধ্যাপনার সূত্রে ত্রিপুরার মতোই তিনি তাঁর বামপন্থী, প্রগতিশীল ইমেজটা বজায় রেখে সরকারি কলেজ অধ্যাপকদের বামপন্থী প্রভাবিত সংগঠনের সদস্যপদ বজায় রেখেছেন। সংগঠনের সভা-সমিতি, সম্মেলনে নিয়মিত তিনি উপস্থিতও থাকেন। কিন্তু জাতিবিচ্ছিন্নতার যে রাজনীতি আরএসএসের অন্যতম সম্বল, সেই রাজনীতির সপক্ষে মতাদর্শগত প্রচারে তিনি নিজের কলেজে, লেখালেখিতে, বক্তৃতায় নিজেকে খুব বেশি রকমভাবেই সক্রিয় রাখেন।

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার সাঁড়াশি আক্রমণ বা ত্রিপুরায় বিজেপির বামপন্থীদের ওপরে ভিন্ন পর্যায়ের আক্রমণ, এই সবই ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মোকাবিলার প্রশ্নে এমন ধরনের ছদ্মবেশী প্রগতিশীল, যারা নানা অছিলায় কোনো না কোনোভাবে বামপন্থী পরিমণ্ডলের মধ্যে ঢুকে পড়ে আরএসএস বা তাদের বিভিন্ন ধরনের সাঙ্গপাঙ্গদের স্বার্থসিদ্ধি করছে, তাদের সম্পর্কে বামপন্থীদের সুনির্দিষ্ট সতর্কতা জরুরি। তা না হলে, আগামী ২ মার্চ যদি ত্রিপুরায় বামপন্থীরা ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে বা আজ (২৭ ফেব্রুয়ারি) পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘিতে বিধানসভার যে উপনির্বাচন হচ্ছে, তাতে যদি শাসক তৃণমূল পরাজিত হয়, তারপর এই ভেকধারী প্রগতিশীলরা ভারতের আসন্ন লোকসভা ভোটে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরকে টিকিয়ে রাখতে আরও উন্নত এবং ক্ষিপ্র কৌশলে তাদের সামাজিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে নেমে পড়বে।

গৌতম রায়, ভারতীয় ইতিহাসবিদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত