Ajker Patrika

গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত, বাধা নয়!

আবেদীন কাদের
আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২১, ১০: ৫৬
গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত, বাধা নয়!

একটি দেশের অর্থনীতি কেমন ধারায় এগোবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে সেই দেশের রাজনৈতিক বা শাসনব্যবস্থা কেমন, তার ওপর। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিপুল গতিতে এগোয়। কিন্তু সেটা স্থায়ী করা সম্ভব হয় না, সেটার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। কথা উঠতে পারে চীনের অর্থনীতি নিয়ে, কিন্তু চীন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত থেকেও অর্থনীতিতে ভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তার পেছনে ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ ও বাজার। অর্থনীতির স্থায়ী কল্যাণের জন্য গণতন্ত্রের বিকল্প নেই।

তবে তার মধ্যেই শ্রমিক বা খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কিছু কল্যাণ-জাল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাধীনতার পর প্রথম প্রায় এক দশক বেশ সমস্যা-জর্জরিত ছিল। এর কারণ আমাদের খাদ্য ঘাটতি, শিল্পায়নের অভাব, অধিক আমদানি ও বেকারত্ব। কিন্তু আশির দশকের শুরু থেকে নিরুপায় তরুণেরা প্রায় নিজেদের উদ্যোগে ব্যাপক হারে বিদেশমুখী হন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অদক্ষ শ্রমিক বিপুল সংখ্যায় যেতে শুরু করেন। ফলে এসব তরুণ প্রায় অশিক্ষিত শ্রমিক এবং কিছু দক্ষ শ্রমিক বড় আকারের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাতে শুরু করেন। দ্বিতীয় আরও কয়েকটি ব্যবসার দুয়ার খোলে। ’৭৮-৭৯ সাল থেকে ইউরোপ ও মার্কিন পুঁজিবাজার বিশ্বায়নের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বড় মার্কিন এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের নিজেদের দেশের স্বল্প প্রযুক্তির শিল্পগুলো দরিদ্র এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় সরিয়ে নেয়। ফলে সবচেয়ে বেশি লগ্নি হয় চীনে, ’৭৮ সালে চীন তাদের শিল্প এবং শ্রমের বাজার যখন খুলে দেয়। সবচেয়ে কম মজুরির শ্রমিক এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থব্যবস্থা থাকার ফলে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের অনেকটাই চীনে চলে যায়। কিন্তু দু-চারটি স্বল্প বিনিয়োগের শিল্প বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়ের শিল্প ছিল বাংলাদেশের জন্য পোশাকশিল্প। দেখা যায় গড়ে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় হতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই পোশাক খাত থেকে আয় দাঁড়ায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। পোশাক ও রপ্তানি করা শ্রমিকের কাছ থেকে দেশের আয় দাঁড়ায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০০০ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পোশাকশিল্প এবং প্রায় ১ কোটির মতো শ্রমিকের বিদেশে আয় হয়ে দাঁড়ায় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল উৎস। দেশে লোকসংখ্যাও ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ফলে নিজেদের শিল্পের জন্য শ্রমিক জোগান দেওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন গণতন্ত্রের সহায়ক কি না!

বাংলাদেশে এই শতাব্দীর গোড়া থেকে প্রবৃদ্ধির হার কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই ৫ বা ৬ শতাংশে দাঁড়ায় প্রায় প্রতিবছর। দক্ষিণ এশিয়ার যে কয়টি দেশের প্রবৃদ্ধির হার নিয়মিত এবং সত্যিই উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশ তাদের একটি। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, আইন বা ব্যাংকিং বা অন্যান্য শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ হয়েছে কি না। সেদিক থেকে বাংলাদেশ প্রায় এক দশকের বেশি সময় শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারেনি; বরং আগের কয়েকটি বছরের তুলনায় শাসনব্যবস্থা বেশি স্বৈরতান্ত্রিক আকার ধারণ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর যেমন নিপীড়ন বেড়েছে, তেমনি মানুষের বাক্‌স্বাধীনতাসহ নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সব জায়গাই ক্ষীণতর আকার নিয়েছে। আদালত থেকে নির্বাহী ব্যবস্থা—সবই তাদের স্বচ্ছতার পরিমাণ হারিয়েছে। এটা দেশের জন্য ভয়ংকর, সন্দেহ নেই। যেসব দেশ উন্নয়নশীল, তাদের সবার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি বেশি, কিন্তু আইনের শাসন একেবারে তলানিতে। বেশসংখ্যক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং তাত্ত্বিকদের আলোচনায় ধরা পড়ে যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন একসঙ্গে সমানতালে চলে না, যাকে পণ্ডিতেরা বলেন, এ দুটো বিসদৃশ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেই! অর্থনৈতিক দিক চিন্তা করলে দেখা যায়, কারণগুলো বিনিয়োগের সহায়ক অবস্থা দাবি করে। যে বাড়তি উদ্বৃত্ত মানুষের হাতে, তা বিনিয়োগ হয়, নয়তো সমাজ বাজে ক্ষেত্রে ব্যয় করে। কিন্তু একমাত্র স্বচ্ছ এবং শ্রেয় পথে বিনিয়োগ ও অতিরিক্ত ব্যয় হ্রাস করার ব্যবস্থা নেওয়া। বাংলাদেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে বিনিয়োগের স্বচ্ছ ব্যবস্থার অভাবে অর্থ পাচার, প্রয়োজনের বাইরে বিলাসী ব্যয় বেড়ে যায় এবং তা বেশি বাড়ে সরকারি ব্যবস্থায় ও দুর্নীতি তাকে গ্রাস করে।

পণ্ডিতেরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে গণতান্ত্রিক সরকারও এই দুর্নীতির ব্যয় কমিয়ে আনতে বা স্তব্ধ করতে সক্ষম হয় না; বরং রাজনৈতিক ও দুর্নীতিপরায়ণ সরকারগুলো নিজেরাই দুর্নীতির বড় ইন্সট্রুমেন্ট হয়ে দাঁড়ায়। যেটা বাংলাদেশে ঘটেছে বিপুল পরিমাণে। রাজনৈতিক সরকারের ব্যয় একদিকে, অন্যদিকে লুটেরা ভাগীদারদের দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অকাতরে লুটের মহড়া দেশে নতুন সমান্তরাল একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজেদের ভোটাধিকার দ্বারা ‘ব্যবস্থা’ বদলের সিদ্ধান্তও নিতে পারে না, কারণ রাষ্ট্র জনগণের সেই অধিকারকে প্রায় হরণ করে এবং নিজেদের পছন্দমতো নির্বাচনব্যবস্থা সৃষ্টি করে প্রায় বিতর্কিত একটি প্রলম্বিত সরকারের স্থায়িত্ব বজায় রাখে। এটা বাংলাদেশে নতুন নয়। স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকেই এটা চলছে, বিশেষ করে স্বৈর সেনাশাসকের কাল থেকে। কিন্তু দিনে দিনে তার কর্মকলা বদলিয়েছে এবং বেড়েছে। তবে ভোক্তা এবং ভোটারদের কিছু শঙ্কিত অবস্থা নিরসনের জন্য রাজনীতিবিদেরা স্বল্পমেয়াদি কিছু ব্যবস্থা আবরণ হিসেবে চালু করে।

এমতাবস্থায়, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং ব্যয়ের অসংগতি রয়েই যায়। নিজে পিঠা বানানো এবং খাওয়া দুটো বিষয় একই সঙ্গে সম্ভব না-ও হতে পারে এবং বাস্তবে তা-ই ঘটে। যেসব রাজনীতিবিদের অর্থনীতিতে রক্ষণশীল চিন্তা বাস্তবায়নের ঝোঁক, তাঁরাই ভোটারদের দ্বারা বেশি চাপের সামনে থাকেন—এমন সব নীতিমালা নির্ধারণে, যার ফলে বেশি করে কল্যাণমূলক ব্যবস্থা নিতে হয় এবং আখেরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে। যার পরিণতি দাঁড়ায় যেসব অর্থনৈতিক নীতিমালা অধিকাংশ শ্রমিকশ্রেণির কল্যাণের বিপরীত, তাই নিয়ত সরকারের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। এর আরেকটি দিক লক্ষণীয়, এ রকম অবস্থা যখন চলতে থাকে, তখন রাজনীতিবিদের প্রতিদিনের বুলি হয়ে দাঁড়ায় একধরনের বাষ্পভরা বাকবিস্তার যে রাজনৈতিক শান্তি বা স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জরুরি শর্ত।

বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী শ্যাম হান্টিংটনের এই বক্তব্য বেশি প্রচারিত হয় রাজনীতিকদের বক্তৃতায়। কিন্তু সবাই ম্যাক্স ব্যাভারের বিখ্যাত উক্তি ভুলে যান যে ‘সহিংসতার একচ্ছত্র মালিক রাষ্ট্র’। তাই প্রতিবাদী জনগণের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চলে। সেদিক থেকে অনেকেই যুক্তি দেন যে গণতন্ত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্তরায়। তাই যেসব দেশে ধর্মীয়, এথনিক এবং অন্যান্য বৈষম্য থেকে সহিংসতা বিদ্যমান, সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় খুব ধীরে। তাই যেসব সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রাজনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে, সেখানে দেখা যায় গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনেকটা সংকুচিত হয়ে আসে। জনগণের কথা বলার অধিকার থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতাও অনেকটা রহিত হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের একটি দল মনে করেন, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেশের প্রলম্বিত শান্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক। উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে মানুষের অধিকারকে সংকুচিত করা ছাড়া উপায় নেই। পশ্চিমা দেশগুলো দুই শতাব্দী আগে যখন শিল্পায়নের জোয়ার শুরু করে, তখন তাদের গণতন্ত্র এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। গত শতাব্দীতে কোনো দেশেই বড় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়নি যদি না সেসব দেশে রাষ্ট্র অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতির ওপর রাখছে। এটা প্রায় সব দেশের অভিজ্ঞতা যে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে হলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রায় জরুরি। সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কঠিন, যদিও অসম্ভব নয়, গণতান্ত্রিক উদার নীতিমালার সমাজে এ রকম দ্রুত উন্নয়ন।

যদিও রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া এবং গণতন্ত্রায়ণ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ববাহী বিষয়। অনেক সময়ই দেখা যায় স্বৈরতান্ত্রিক সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের দোহাই তুলে গণতান্ত্রিক অধিকারের গলা চেপে ধরে। আসলে ক্ষমতায় থাকাকে প্রলম্বিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। জনকল্যাণ এবং গণতন্ত্র দুটির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, মূলত স্বৈরতন্ত্র এই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। বিষয়টা দুটি অর্থনৈতিক নীতিমালার, রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করার নয়। তাই আখেরে জনকল্যাণ নির্ভর করে একটি সমাজে মানুষের অধিকার কতটা নিশ্চিত আছে, তার ওপর। যে সমাজে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, সেই সমাজে আসলে উন্নয়নও সময়ের দীর্ঘ পরিসরে 
হত্যা করা হয়।

আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা এসব বিষয়, অর্থাৎ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে সভ্যসমাজে ৫০ বছরে আধুনিক রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার প্রায় সব প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের সব প্রতিষ্ঠান শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর কথা। কিন্তু বাংলাদেশ তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে আমাদের স্বাধীনতার পর এই ৫০ বছরে কি শ্রেয় কাজ সমাজে কিছুই হয়নি? হয়েছে, অনেক কিছুই হয়েছে, সেগুলো নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। সেগুলোই বাঙালির শক্তির জায়গা। কিন্তু সেসব কোনো কিছুই প্রায় রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলগুলোর অবদান নয়, সেগুলো অর্জন করেছে সাধারণ মানুষ, সরকার সেখানে সহায়ক শক্তি। 

লেখক: আবেদীন কাদের  প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক, এসেক্স কলেজ, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত