Ajker Patrika

চিরস্মরণীয় ১০ জানুয়ারি

ড. এম আবদুল আলীম
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ১৬: ৩৮
চিরস্মরণীয় ১০ জানুয়ারি

জাতির জীবনে কখনো কখনো এমন দিন আসে, যা চিরকাল স্মরণে থাকে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি এমনই এক গৌরবদীপ্ত দিন। সেদিন স্বাধীন বাংলাদেশে বীরের বেশে ফিরে এসেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিরানব্বই হাজার সৈন্য সঙ্গে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তানি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম আর অগণিত মানুষের কঠিন ত্যাগের বিনিময়ে দীর্ঘকালের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে জাতি সেদিন বিজয়ের গৌরবে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি এবং বিজয়ের উল্লাসে স্বাধীন বাংলার আকাশ-বাতাস সেদিন প্রকম্পিত হয়েছিল। কিন্তু এই বিজয়ের আনন্দে কোথায় যেন একটু অপূর্ণতা ছিল, সব পেয়েও যেন এক না-পাওয়ার বেদনা জাতিকে পেয়ে বসেছিল। কী ছিল সেই বেদনা? সেই বেদনা ছিল, পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করার সংগ্রামে নেতৃত্বদান করতে গিয়ে যিনি বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, অসহনীয় জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার পথে জাতিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মহান নেতার পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকা। প্রশ্ন আসতে পারে, এই মহান নেতার অনুপস্থিতি কেন বিজয়ের পূর্ণ আনন্দ থেকে স্বাধীন বাংলার মানুষকে বঞ্চিত করেছে? কেনইবা তাঁর জন্য জাতি ছিল অধীর অপেক্ষায়?

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই অঞ্চলের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। স্বপ্ন দেখেছিল সুন্দর ভবিষ্যতের এবং সুখী জীবনের। কিন্তু বিধি বাম। পাকিস্তানি শোষণ-দুঃশাসনে অল্প দিনের মধ্যেই তাদের সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, আশা পরিণত হয় মরীচিকায়। এমন পরিস্থিতিতে তারা আবারও সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়ে নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করে। ভাষাশহীদদের রক্ত থেকে যে সংগ্রামের বীজ উপ্ত হয়; তা-ই চুয়ান্নর নির্বাচন, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ। এই দীর্ঘ সংগ্রামে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অনেক নেতার অবদান থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিণত হন অবিসংবাদিত নেতায়। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্বের সম্মোহনী শক্তি, দৃঢ়তা, লক্ষ্যে অবিচল থাকা–সব দিক থেকেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। পাকিস্তানিদের শোষণের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। ছয় দফা কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। সামরিক জান্তা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে প্রহসনের বিচার দ্বারা তাঁকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করলেও বাংলার ছাত্রসমাজ ও সংগ্রামী জনতার প্রতিরোধের মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি। শেখ মুজিবকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে তারা ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। তাঁর নেতৃত্বকে শিরোধার্য করেই সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশভাবে জয়ী করেছে। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এই অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানি দুঃশাসনকে লাল কার্ড দেখিয়েছে। পুরো জাতিকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত ও ঐক্যবদ্ধ করে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। শুধু তা-ই নয়, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে তিনি শত্রুকে মোকাবিলার আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নির্বিচারে গণহত্যা চালায় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে, তখন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি (তাঁর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হয়) এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য পুরো দেশকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। সর্বস্তরের মানুষ যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে তাঁরা অমিতবিক্রমে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের ধ্বনি ছিল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মূল প্রেরণামন্ত্র। পাকিস্তানের কারাগারে থেকেও যে নেতা ছিলেন সংগ্রামের সব প্রেরণার উৎস, তাঁর অনুপস্থিতিতে বিজয়ের আনন্দে অপূর্ণতা থাকবে–এটাই স্বাভাবিক।

অবশেষে আসে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশ্বনেতাদের চাপে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি লন্ডন ও দিল্লি হয়ে দেশে ফেরেন। সময়টি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। তাঁকে বহনকারী বিমানটি যখন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে অবতরণ করে, তখন লাখো মানুষ আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে। তুমুল হর্ষধ্বনি আর ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে চারদিক মুখরিত হয়। এমন আনন্দ-উল্লাসপূর্ণ মুহূর্ত জাতির জীবনে যেন আর আসেনি কখনো। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি চলে যান রেসকোর্স ময়দানে। জনসমুদ্রে নির্মিত মঞ্চে উঠেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর চোখে-মুখে ছিল বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি আর আনন্দমিশ্রিত কান্না। রেসকোর্সের হর্ষোৎফুল্ল বিশাল জনসমুদ্রে তিনি আবেগদীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন: ‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, মুসলমান একবার মরে, দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব, আমার বাঙালি জাতিকে অপমান করে যাবে না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।’ বাংলার মানুষের কাছে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাইকে কাজ করতে বলেন। ইতিহাসের সেই স্বর্ণোজ্জ্বল মুহূর্তের সাক্ষী তোফায়েল আহমদ বলেছেন, ‘১০ জানুয়ারি চিরস্মরণীয়। অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭২ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এই প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করেছে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশিরা স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে পারেনি। যেদিন বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন, সেদিনই স্বাধীনতার পূর্ণতা লাভ করেছে।’

আবারও আমাদের মাঝে এসেছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। জাতির জীবন আনন্দে ভরে উঠুক ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির মতো। জাতির পিতার সংগ্রামী জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ ভোগ করুক স্বাধীনতার সুফল। দূর হোক রাজনৈতিক হানাহানি। ধ্বংস হোক সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। গড়ে উঠুক দুর্নীতি, শোষণ এবং বৈষম্যমুক্ত উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ। যে সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করেছেন, সেই বাংলাদেশ গড়ার শপথই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।

গবেষক-প্রাবন্ধিক; শিক্ষক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত