Ajker Patrika

ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প: ৫৪৮ কোটিতে ২২০ ভবন চার বছরেই বেহাল

  • ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো সোলার প্যানেল নষ্ট।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ট্যাংক ও গভীর নলকূপ অচল।
  • আম্পানসহ কয়েকটি ঝড়ে সুবিধা পায়নি এলাকাবাসী।
  • নকশার দুর্বলতা ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থায় ঘাটতির অভিযোগ।
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প: ৫৪৮ কোটিতে ২২০ ভবন চার বছরেই বেহাল
ফাইল ছবি

‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে’ বছর চারেক আগে ৫৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল সরকার। এরই মধ্যে ১৬ জেলায় নির্মিত এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করেছে। দেয়ালে ফাটল ধরা, ছাদ ও দেয়াল থেকে প্লাস্টার খসে পড়া এবং দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো নানা সমস্যায় স্থাপনাগুলো। ব্যয়বহুল ২২০টি সোলার প্যানেল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কয়েকটি গভীর নলকূপও অচল। সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) করা প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও স্থাপনাগুলোর দুরবস্থার এই চিত্র উঠে এসেছে।

প্রকল্পের সময় দ্বিগুণ, বেড়েছে ব্যয়

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের প্রকল্পটির কাজ ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালে। কিন্তু সময়মতো শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পরে আরেক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়। প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫৩৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় দফায় ২০১৯ সালে মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে ব্যয়ও ২৩ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ৫৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ছিল ৯৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। কাগজে-কলমে এটি সফল হলেও বাস্তবে এর স্থায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পের নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যে ত্রুটি ছিল এবং প্রকল্পে যে অনিয়ম হয়েছে, তা খালি চোখে দেখা যায়। সঠিক সময়ে কাজ শেষ না করায় সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। তবু সব কাজ নকশা অনুযায়ী শেষ হয়নি।

সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষ

প্রকল্পটি পরিকল্পনামতো ২০১৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মানুষ ঝড়ের সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রের সুবিধা পায়নি। এই সময়ে ঘূর্ণিঝড় মোরা, বুলবুল, আম্পান ও ইয়াস উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এসব ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটে; বিশেষ করে ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ২৫ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে ব্যত্যয় হয়েছে। বছরের পর বছর এ ধরনের প্রকল্পে অনিয়ম হলেও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হলে অনিয়ম কমতে পারে।’

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার আইডিয়াল মহিলা কলেজের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনের তৃতীয় তলার ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে। গভীর নলকূপ ও সোলার প্যানেল নষ্ট।

কক্সবাজার সদর উপজেলার মাতামুহুরী এলাকার পূর্ব ভেওলার জয়নাল আবেদীন মহিউচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসার আশ্রয়কেন্দ্রটির সোলার প্যানেল চালু থাকলেও ছয়টি ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। আট কক্ষের ভবনটির চারটি জানালা ক্ষতিগ্রস্ত। দেয়ালের রং খসে পড়েছে।

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালী ইউনিয়নের সুখদাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা গেছে। দরজা, জানালা, গ্রিল ও কাচের অনেক অংশ ভাঙা। পানির ট্যাংক থাকলেও সংযোগ নেই। নলকূপ অচল, বিদ্যুতের মিটার থাকলেও সংযোগ নেই। বাথরুমগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বটিয়াঘাটার বালিয়াডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খান মনিরুজ্জামান বলেন, নির্মাণকাজে ব্যাপক ত্রুটি ছিল। দীর্ঘদিন নষ্ট হয়ে থাকা অবকাঠামো সংস্কারে কিছু করা হয়নি। শিয়ালীডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রেও অধিকাংশ জানালার কাচ ভাঙা, সোলার অচল এবং কয়েকটি দরজা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) করা প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও প্রকল্পের বেহাল চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এসব অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

আইএমইডি বলেছে, বরগুনার আমতলীর ডিগ্রি কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রের সোলার প্যানেল অকার্যকর, পাম্পমোটর নষ্ট এবং দেয়ালের প্লাস্টার উঠে যাচ্ছে। কয়েকটি কক্ষ, র‍্যাম্প ও সিঁড়ির পাশের দেয়ালে ফাটল দেখা গেছে। জানালার কাজও ভালো না হওয়ায় অতিবৃষ্টির সময় জানালা দিয়ে কক্ষে পানি ঢোকে।

ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হলে জরুরি সময়ে আলো ও পানির পাম্প চালানোর জন্য ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫০০ ওয়াট ক্ষমতার সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছিল। আইএমইডির মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের সব কটি সোলার প্যানেলই এখন অকেজো।

আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংকগুলো অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ২২০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও বসানো হয়েছে ১৮৬টি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটির মোটরও নষ্ট হয়ে গেছে।

নকশা ও পরিকল্পনায় ত্রুটি

উপকূলের দরিদ্র মানুষের অন্যতম প্রধান সম্পদ গবাদিপশু। প্রকল্পের অনুমোদিত পরিকল্পনায় প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে গবাদিপশুর আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ১২০টি কেন্দ্রে তা নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার ব্যাখ্যা, উপযুক্ত জমি পর্যাপ্ত না থাকাই এর কারণ। কিন্তু প্রকল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির উপযোগিতা যাচাই প্রকল্প অনুমোদনের আগেই করা উচিত ছিল। অনুপযুক্ত জমির নকশা নিয়ে প্রকল্প অনুমোদন করা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতাই নির্দেশ করে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবাদিপশুর জন্য কোনো জায়গা না থাকায় দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রকল্পের বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের উচিত রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প না নিয়ে, প্রয়োজন অনুসারে সঠিক সমীক্ষা করে প্রকল্প নেওয়া। তা না হলে প্রকল্পে অনিয়ম ও লুটপাট হতেই পারে। একই সঙ্গে যারা এই প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে বিনিয়োগ থেকে পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।

সরকারি মহলের বক্তব্য

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও সাবেক যুগ্ম সচিব অঞ্জন চন্দ্র পাল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছরের ২৬ জুলাই সরকার যে ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে, তাঁদের মধ্যে তিনি রয়েছেন।

জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পরিতোষ হাজরা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আইএমইডির প্রতিবেদন দেখার পর প্রকল্প পরিদর্শন করে আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি) আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা বাস্তব চিত্র তুলে ধরছি। ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে কঠোরভাবে নজর দেওয়া হবে।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন খুলনার বটিয়াঘাটা, কক্সবাজার সদর উপজেলার মাতামুহুরী এবং সাতক্ষীরার তালা উপজেলা প্রতিনিধি।]

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত