Ajker Patrika

এল নিনো: স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১০: ৪৮
এল নিনো: স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায়
নানা কারণে মানুষ ২০২৪ সালকে ভবিষ্যতে সবচেয়ে শীতলতম বছর হিসেবে মনে রাখতে পারেন। ছবি: এএফপি

প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং আগামী কয়েক মাসে এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এর ফলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে বলে গতকাল মঙ্গলবার সতর্ক করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। একই সঙ্গে, এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হবে।

এল নিনো (El Niño) হলো একটি স্বাভাবিক ও সাময়িক জলবায়ুগত অবস্থা। মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠার কারণে ঘটে। এটি একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘খ্রিষ্টশিশু।’ পেরু ও ইকুয়েডরের জেলেরা সাধারণত বড়দিনের কাছাকাছি সময়ে সমুদ্রের এই উষ্ণতা লক্ষ করত বলে এর এমন নামকরণ হয়েছে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এই পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং এটি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে।

এল নিনোর কারণে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সাধারণত যেসব এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হয়, সেখানে দেখা দেয় খরা; আর যেসব এলাকা শুষ্ক, সেখানে নেমে আসে প্রবল বন্যা। এর ফলে, দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম পানি বা বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা তীব্র খরার রূপ নিতে পারে।

ডব্লিউএমওর নতুন এল নিনো/লা নিনা-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট সময়কালে এল নিনো ঘটার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত এল নিনো পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি। অধিকাংশ পূর্বাভাস মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি অন্তত মাঝারি মাত্রার হবে এবং সম্ভবত শক্তিশালী পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউএমও।

গত ৩০ এপ্রিল প্রকাশিত ডব্লিউএমওর মৌসুমি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন-সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টির মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। সবচেয়ে শক্তিশালী সংকেত দেখা যাচ্ছে মধ্যাঞ্চলগুলোতে। ডব্লিউএমও প্রকাশিত মানচিত্রে ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় পুরো অংশেই স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের ইঙ্গিত দেখানো হয়েছে।

ডব্লিউএমওর এল নিনো হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে ডব্লিউএমওর গ্লোবাল প্রডিউসিং সেন্টারগুলোর মডেল, জাতীয় আবহাওয়া ও জলবিদ্যা সেবা সংস্থার বিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। এগুলো ডব্লিউএমও এবং ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড সোসাইটির (আইআরআই) যৌথ উদ্যোগে প্রস্তুত করা হয়।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে বলছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ৯০ শতাংশ নিশ্চয়তা নিয়ে এল নিনো আমাদের দুয়ারে এসে উপস্থিত হচ্ছে। বিশ্বকে এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীর আগুনে আরও জ্বালানি ঢালবে এল নিনো পরিস্থিতি। এর প্রভাব আরও তীব্র হবে, আরও দূর পর্যন্ত ছড়াবে এবং বিধ্বংসী গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করবে।’

এই পরিবেশগত সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছে মহাসচিব বলেন, ‘এর একমাত্র কার্যকর জবাব হলো—সংকটের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণ করা। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার আসক্তি শেষ করতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে হবে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং সবার জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শেষ ভাগ থেকে মে মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত মধ্য-পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এল নিনোর সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিল। এই পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রার এই বৃদ্ধি পেছন থেকে জোগান পাচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণ ভূগর্ভস্থ জলস্তর থেকে। সেখানে তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল। এই বিপুল তাপভাণ্ডার সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘সম্ভাব্য শক্তিশালী একটি এল নিনো ঘটনার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এটি খরা ও অতিবৃষ্টির পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করবে এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। ২০২৩-২৪ সালের সর্বশেষ এল নিনো ছিল রেকর্ডে থাকা পাঁচটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনার একটি এবং ২০২৪ সালে আমরা যে রেকর্ড বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেখেছি, তাতে এরও ভূমিকা ছিল।’

সাধারণত এল নিনোর সঙ্গে দক্ষিণ দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের কিছু এলাকা এবং মধ্য এশিয়ায় বেশি বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে মধ্য আমেরিকা, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে তুলনামূলকভাবে শুষ্ক পরিস্থিতি দেখা যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত