Ajker Patrika

১৪ বছর একটি পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াল এক হাতি, ৪ সদস্যকে ‘হত্যা’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
১৪ বছর একটি পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াল এক হাতি, ৪ সদস্যকে ‘হত্যা’
বাড়ি বদল করেও পাগলা হাতির হাত থেকে রেহাই পায়নি একটি পরিবার। প্রতীকী ছবি

১২ ডিসেম্বর ২০১২। নেপালের চিতবন জাতীয় উদ্যানের বাউন্ডারি ঘেঁষা মাদি এলাকার বারুয়া বাজারে নিথর হয়ে বসে ছিলেন শনিচরা বোটে। পাশে পড়ে ছিল তাঁর বাবা বুধিরাম এবং মা ঝরালির রক্তাক্ত মরদেহ। ‘ধুর্বে’ নামের একটি কুখ্যাত বুনো হাতি তাঁদের পিষে মেরে ফেলেছিল।

সেই দুঃসহ ট্র্যাজেডির পর বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজের পরিবারকে বাঁচাতে শনিচরা তাঁর ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকার লড়াই ছেড়ে দেন। ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে রেউ নদী পার হয়ে, জাতীয় উদ্যানের মূল সীমানা এড়িয়ে, রাপ্তি নদী পেরিয়ে জগতপুরে নতুন বসতি গড়ে তোলেন। ভেবেছিলেন, নদী পার হয়ে দূরে চলে গেলে হয়তো হিংস্র হাতির হাত থেকে রেহাই মিলবে।

কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই ঘাতক হাতি ‘ধুর্বে’ যেন তাড়া করে ফিরল তাঁদের।

গত ৪ জুলাই গভীর রাতে জগতপুরের নতুন বাড়িতে হানা দেয় একই হাতি। মাটির দেয়াল ভেঙে ঘরে ঢুকে শনিচরার ২৫ বছর বয়সী পুত্রবধূ আশিকা বোটে এবং তাঁর চার বছরের নাতি ভরত বোটেকে পিষে হত্যা করে।

মাত্র ১৪ বছরের ব্যবধানে একই বুনো হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে পরিবারের চার-চারজন সদস্যকে হারাল শনিচরার পরিবার। এই ঘটনা নেপালের সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে বন্যপ্রাণী ও মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনের সরকারি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে আবারও সামনে এনেছে।

গত ৫ জুলাই দুপুরে চিতবন জেলা পুলিশ কার্যালয়ের সামনে যখন ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছিল, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন শনিচরা। তিনি বলেন, ‘আমরা মাদির দ্রোপতিনগরে থাকতাম। হাতির ভয়ে সবকিছু বিক্রি করে জগতপুরে চলে আসি। ভেবেছিলাম নদী পার হলে আমরা নিরাপদে থাকব। কিন্তু এত বছর পর সেই একই হাতি আমাদের খুঁজে বের করল। আমার পুত্রবধূ আর ছোট্ট নাতিটাকে কেড়ে নিল। আমাদের আর পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’

এই ঘাতক হাতির অতীত ইতিহাস

চিতবন জাতীয় উদ্যানের কর্মকর্তাদের নথিপত্র অনুযায়ী, ধুর্বে নামের এই পুরুষ হাতিটির হিংস্রতার ইতিহাস দীর্ঘ। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, তরুণ পুরুষ হাতিরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে, তখন দলের প্রধান পুরুষ হাতিরা তাদের তাড়িয়ে দেয়। ফলে এরা একাকী ও হিংস্র জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হানা দেয়।

উদ্যানের তথ্য কর্মকর্তা অবিনাশ থাপা মগর জানান, ২০১০ সাল থেকে ধুর্বে মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করে। এ পর্যন্ত এই একটি হাতির আক্রমণে অন্তত ২৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে বন্যপ্রাণী পাচার রোধ ও পার্কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুজন সেনা সদস্যও রয়েছেন।

অবিনাশ থাপা বলেন, ‘শনিবার (৪ জুলাই) রাতেও আমাদের স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং কলারে দেখা গেছে যে ধুর্বে ঠিক ওই ঘটনাস্থলের আশপাশেই অবস্থান করছিল। এই নতুন দুটি মৃত্যুর পর তার মাধ্যমে মোট নিহতের সংখ্যা ২৫-এ দাঁড়াল।’

২০১২ সালে শনিচরার মা-বাবার মৃত্যুর পর তৎকালীন জেলা প্রশাসকের নির্দেশে হাতিটিকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেনা ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে হাতিটিকে দুটি গুলি করা হলেও সে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যায়। ওই অভিযানে সরকারের প্রায় ১৬ লাখ রুপি খরচ হয়েছিল। পরে সবাই ধরে নিয়েছিল হাতিটি মারা গেছে, কিন্তু ২০১৬ সালে সেটিকে আবার চিতবনের পশ্চিমাঞ্চলে দেখা যায়।

এরপর ২০২০ এবং ২০২৩ সালে হাতিটির গলায় স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং কলার পরানো হয়, যা প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর উদ্যানের কেন্দ্রীয় কম্পিউটারে হাতিটির অবস্থান পাঠায়। নিয়ম অনুযায়ী, হাতি লোকালয়ের কাছাকাছি এলে সেনা ও বন বিভাগের কর্মীরা গিয়ে সেটিকে জঙ্গলে তাড়িয়ে দেয়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই ট্র্যাকিং সিস্টেমে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। ঘাইলাঘারি বাফার জোন কমিটির চেয়ারম্যান লাল বাহাদুর দাওয়াদি বলেন, ‘গত ৯-১০ দিন ধরে ধুর্বে এই বনের সীমানায় ঘুরছিল। পার্ক কর্তৃপক্ষ সবই জানত, কিন্তু কোনো আগাম সতর্কতা নেওয়া হয়নি।’

জগতপুরের ৭২ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা কেশব লামিছানে বলেন, ‘ধান ও ভুট্টা পাকার মৌসুমে প্রতি বছর ধুর্বে নিয়ম করে এখানে আসে। কয়েক বছর আগে সে মানুষের ঘর থেকে চালের বস্তা পিঠে করে নিয়ে জঙ্গলে পালিয়েছিল। কিন্তু আমাদের এলাকায় এভাবে মানুষকে পিষে মারার ঘটনা এটাই প্রথম।’

শনিচরার ভাঙাচোরা টিনের চালের মাটির ঘরে গাদাগাদি করে পরিবারের ৯ জন সদস্য বাস করতেন। ৪ জুলাই রাতের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা মনে করে শনিচরা বলেন, ‘রাতে হঠাৎ মনে হলো কে যেন দেয়ালে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। বাইরে গিয়ে দেখি হাতি। চোখের পলকে মাটির দেয়াল ধসে পড়ল। আমার পুত্রবধূ নাতিকে কোলে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করতেই হাতিটি তাদের ধরে ফেলে।’

শনিচরার স্ত্রী মঙ্গলি বারান্দায় থাকা শুকনো খড়কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে হাতির দিকে ছুড়ে মারেন। আগুনে ঘরটি পুড়ে গেলেও বাকি সদস্যদের জীবন বেঁচে যায়।

এই ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা পার্ক কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলার প্রতিবাদে রাপ্তি নদীর ওপর সেতু অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ধুর্বেকে স্থায়ীভাবে ‘সুখভার’ বনাঞ্চলের ভেতরে আটকে রাখবে এবং ভবিষ্যতে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। তবে এই প্রতিশ্রুতি শনিচরা বোটের পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি আর বুকফাটা আর্তনাদকে শান্ত করতে পারছে না।

তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত